অপরাধ ডেস্ক: রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিকাশ চন্দ্র শাহ নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
রোববার (৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে মাগুরা থেকে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে গুলশান গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। বিকাশ পেশায় একজন ঠিকাদার। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর-লুটপাটে অংশ নেওয়া লোকজনকে ভাড়া করার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
বিকাশকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গুলশান গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিকাশ আসামি না হলেও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ডিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হামলার পরিকল্পনায় কারা জড়িত ছিলেন, কারা সরাসরি অংশ নিয়েছেন এবং কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছেন- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে একই ঘটনায় আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন, আসলাম ও মুন্না। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সাতজনই বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তার হওয়া মামুন এবং বাহিনীপ্রধান মফিজুর রহমান মামুন আলাদা ব্যক্তি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হামলার দিন আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রায় ২০০ জন নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে যায়। তাদের কেউ ৫টি পিকআপে করে, আবার কেউ হেঁটে সেখানে পৌঁছান। রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রকল্পের মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা চালানো হয়।
সূত্র আরও জানায়, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। ওই দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে ১৩ জনকে দেখা যায়। তাদের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন আগে গ্রেপ্তার হওয়া শাহরিয়ার মাহমুদ এবং পরে গ্রেপ্তার হওয়া বিকাশ চন্দ্র শাহ। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে হামলার পরিকল্পনা করা হয় এবং এতে শাহরিয়ার ও বিকাশ যুক্ত ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বিকাশ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণের কাজ করেন। নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে জমি নিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরোধ ছিল। বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল বিকাশকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বসে মূল পরিকল্পনাকারীরা চূড়ান্ত বৈঠক করেন. ওই দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ ১৩ জন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া শাহরিয়ার মাহমুদ এবং ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে স্পষ্ট দেখা গেছে. হামলার জন্য বিপুলসংখ্যক জনবল সংগ্রহের মূল দায়িত্বটি পান ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র. তিনি নিজের অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম এবং পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ান বিএনপি সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন (যাকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে) এর বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেন. এই দুই রাজনৈতিক নেতার অনুসারী ও অপরাধী চক্রের সদস্যরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে এই তাণ্ডবে অংশ নেয়. পাঁচটি পিকআপ ভ্যানে করে দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা আবাসন প্রকল্পে হানা দেয়।
এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছে দেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউন ফিশ’ স্টুডিও. এই আবাসন প্রকল্পের ভেতরেই তাঁর স্টুডিওটি অবস্থিত ছিল. হামলাকারীরা মূল ভবনে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ভেতরে অনাধিকার প্রবেশ করে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়. তারা স্টুডিওর মূল্যবান ল্যাপটপ, প্রফেশনাল ক্যামেরা ও শুটিংয়ের কোটি টাকার মিডিয়া ইকুইপমেন্টসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ভাঙচুর ও লুটপাট করে নিয়ে যায়।
ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে চলাচলের রাস্তার ব্যবস্থা করার দায়িত্বও ছিল বিকাশের। তবে নাজিম উদ্দিন রাস্তা দিতে রাজি হননি। এ বিরোধের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
/রাশিদুল রাশেদ/




