ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeবিনোদননির্মাতা হুমায়ূনের সব সিনেমাই পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার

নির্মাতা হুমায়ূনের সব সিনেমাই পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার

বিনোদন ডেস্ক : বাংলা সাহিত্য ও সিনেমার ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদ একটি জ্বলজ্বলে নাম। কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা—যে পরিচয়ে তাঁকে দেখা হোক না কেন, তিনি ছিলেন এক অনন্য সৃষ্টিশীল মানুষ। আজ (১৩ নভেম্বর) তাঁর ৭৭তম জন্মবার্ষিকী। লিখনীর পর্দা পেরিয়ে যখন তিনি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ালেন, তখনও যেন তাঁর কলমের সেই মায়াবি জাদু সিনেমার ফ্রেমে ধরা পড়ল।

মাত্র আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো-প্রতিটি চলচ্চিত্রই পেয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই বিরল অর্জন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তাঁকে আলাদা উচ্চতায় বসিয়েছে।

প্রথম ছবি আগুনের পরশমণি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই সিনেমা ছিল তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের অনবদ্য সূচনা। আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত ও বিপাশা হায়াত অভিনীত এই ছবিতে যুদ্ধের গল্প নয়, দেখা যায় এক পরিবারের ভয়, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াই। প্রথম চলচ্চিত্রেই বাজিমাত করেন হুমায়ূন-পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালনাসহ আটটি বিভাগে স্বীকৃতি।

পাঁচ বছরের বিরতি শেষে ১৯৯৯ সালে আসেন শ্রাবণ মেঘের দিন নিয়ে। প্রেম, বেদনা ও গ্রামের সহজ জীবনের মেলবন্ধনে গড়া এই ছবিটিও জিতে নেয় সাতটি জাতীয় পুরস্কার। গানের সুর, সংলাপ, আবহ-সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের আরেক মাইলফলক।

২০০০ সালে মুক্তি পায় দুই দুয়ারী-একটা যাত্রা, এক নিঃসঙ্গতা, আর এক আত্মদর্শনের গল্প। রিয়াজ, মাহফুজ আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওনের অভিনয়ে এই সিনেমা পায় দর্শকের প্রশংসা ও জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি।

এরপর আসে ২০০৩ সালের চন্দ্রকথা-লোকজ উপকথা আর আধুনিক বাস্তবতার সংমিশ্রণে গড়া এক ব্যতিক্রমী সিনেমা। আসাদুজ্জামান নূর, আহমেদ রুবেল ও শাওনের অভিনয়ে এটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীসহ বিশেষ পুরস্কার অর্জন করে।

২০০৪ সালে মুক্তি পায় শ্যামল ছায়া-মুক্তিযুদ্ধের আবহে নির্মিত তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। ছোট মানুষের চোখ দিয়ে দেখা যুদ্ধের এই কাহিনিতে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘বর্ষার প্রথম দিনে’ গানটি আজও দর্শকের হৃদয়ে অনুরণিত। গানটির জন্যই শিল্পী পান জাতীয় পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য যে, শ্যামল ছায়া-ই ছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রথম আনুষ্ঠানিক মনোনীত ছবি।

এরপরের দুই ছবি-নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৭) এবং আমার আছে জল (২০০৮)-দুটিতেই ফুটে ওঠে তাঁর পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন, ভালোবাসা ও হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। ফেরদৌস, মিম, জাহিদ হাসান ও শাওনের অভিনয়ে আমার আছে জল পায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের দুটি বিভাগে জয়।

জীবনের শেষ চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলা মুক্তি পায় ২০১২ সালে। ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা এক নিষিদ্ধ গল্প-সুর ও যন্ত্রণার মিলনে গড়া এক কাব্যিক নির্মাণ। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তিনি ফিরে এসেছিলেন ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীতে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত চলচ্চিত্রের প্রতি এমন নিবেদনই হয়তো হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এই সিনেমার জন্যও তিনি পান সেরা পরিচালকসহ একাধিক জাতীয় পুরস্কার।

হুমায়ূন আহমেদের সিনেমাগুলো কেবল পুরস্কারজয়ী নয়, এগুলো সময়ের সাক্ষীও। তাঁর সংলাপে ছিল জীবনের গন্ধ, তাঁর গল্পে ছিল আমাদের চারপাশের মানুষ। হাসি, বেদনা, প্রেম আর একরাশ আলো-ছায়ার মেলবন্ধনে তিনি যে জগৎ তৈরি করেছিলেন, সেটি আজও বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular