ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅপরাধপরিকল্পিত উসকানিতে গণপিটুনি, ছয় মাসে ১২১ জন নিহত

পরিকল্পিত উসকানিতে গণপিটুনি, ছয় মাসে ১২১ জন নিহত

মোহাম্মদ রুবেল:  কাউকে কেবল সন্দেহের বশত অপরাধী বলে চিহ্নিত করে, তারপর জনমত তৈরির মধ্যদিয়ে গণপিটুনি দিয়ে মেরেফেলা বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে গত ৫ আগষ্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই যে হারে গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে চলছে এবং তাতে মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ পর্যন্ত যাদেরকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে কখনও বিগত সরকারের কর্মী-সমর্থক সন্দেহে, কখনওবা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আবার কখনও চুরির সন্দেহে।

চলমান এসব ঘটনায় মানবাধিকার কর্মীরা বেশ উদ্বিগ্ন এবং সচেতন মহল। তারা গণপিটুনির মতো এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়াকে পরিকল্পিত উসকানিকে কারণ হিসবে দেখছেন। এও বলছেন এর পেছেনে সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও তদন্তের ঘাটতি একটা বড় কারণ। সর্বোপরি এসবের বিরুদ্ধে যথাযথ কোন পদক্ষেপ নিতে না পারায় এসব গণপিটুনি থামানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, অর্ন্তবর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জনগণের প্রতি আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, জনগণকে বলবো আইন আপনারা নিজের হাতে তুলে নেবেন না। আর পুলিশকে বলবো আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার জন্য। যেন এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। এছাড়াও কিছুদিনের মধ্যে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল বাড়ানো হবে।

বুধবার সাভারের রাজালাখ এলাকায় হর্টিকালচার সেন্টারে কৃষকের মিনি কোল্ড স্টোরেজ কার্যক্রম ও ‘খামারি’ অ্যাপসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিনি আহ্বাবান জানান।

সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার রাতে একটি রাজধানীর উত্তরায়, অন্যটি রাজধানী লাগোয়া গাজীপুরের টঙ্গীতে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। দুটি ঘটনাতেই ‘ছিনতাইকারী’ সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে স্থানীয় লোকজন দলবদ্ধ হয়ে ঘটিয়েছে।

উত্তরায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করার পর পায়ে দড়ি বেঁধে পদচারী–সেতুর সঙ্গে তাঁদের উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এই ব্যক্তিরা হলেন মো. নাজিম (৪০) ও মো. বকুল (৩০)। রাত ১০টার দিকে উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। উত্তরার ঘটনায় কারও প্রাণ যায়নি। কিন্তু টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে নিহত ওই যুবকের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ।

এরআগে চলতি মাসেই জহির উদ্দিন (৪০) নামের এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে প্রথমে দফায় দফায় মারধর করা হয়। এরপর খুঁটিতে বেঁধে ভিডিও ধারণ করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর আহত ওই ব্যক্তি ওই অবস্থায় মারা যান। ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৯ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ছবিরপাইক গ্রামে। এ ঘটনার বেশ কয়েকটি ভিডিও মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

এছাড়া শেরপুরের নকলা উপজেলায় গরুচোর সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রোববার দিবাগত রাতে নকলা পৌরসভার দক্ষিণ নকলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় আরও চারজন আহত হয়েছেন।

গণপিটুনির মতো এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণ আছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান।

তিনি বলেন, প্রথমত, এটি ঘটছে পরিকল্পিত উসকানির কারণে। সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা একটা বড় কারণ। হয়তো ইচ্ছা করেই এ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণেই বেড়ে যাচ্ছে গণপিটুনির প্রবণতা।

তিনি আরও বলেন, গতকালকে ঘটে যাওয়া এ দুটি ঘটনাই ছিল বীভৎস। আবার এসব গণপিটুনির ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও দেওয়া হয়েছে। উত্তরার ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন এক ব্যক্তির পায়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় তাকে ফুট ওভার ব্রিজের লোহার খুঁটির সঙ্গে উল্টো করে বাঁধছিলেন হলুদ রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে ওপরে তুলছিলেন।

এসব নির্বিচারে গণপিটুনি এবং তাতে হত্যাকান্ড ঘটনায় একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে বিগত ছয় মাসে এ ধরনের গণপিটুনির ঘটনা ও নিহত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

অপরাধ ও বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের শিকার হওয়ার আতঙ্ক থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নিতে পারে। সেটা ঠেকাতে অপরাধ দমাতে হবে। আবার যাঁরা আইন হাতে তুলে নেন, তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

উত্তরা ও টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের অতিষ্ঠ হয়ে পড়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্রকেই তুলে ধরে। দিনের পর দিন এসব ঘটনা বাড়লেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করছেন এসব ব্যক্তি।

বিজ্ঞ আইজীবী শাহদীন মালিক বলেন, গণপিটুনি এখন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো প্রচেষ্টা সরকারিভাবে দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের চাকরি ও বদলি নিয়ে তটস্থ। আমলাতন্ত্র পরিচালনাও যথাযথ নয়। আমি বলছি না যে প্রশাসনের যেসব অপরাধী আছে, তাদের বিচার করা যাবে না। কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার এমন দুরাবস্থা থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকারকর্মীদের সংগঠন সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (সাহার) বাংলাদেশ ব্যুরো সদস্য সাঈদ আহমেদ বলেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। কয়েক বছর ধরেই এ আস্থাহীনতা বেড়েছে। তবে আস্থাহীনতার কথা বলে কোনো গণপিটুনিকেই সমর্থন করা যায় না।

সাঈদ আহমেদ বলেন, আস্থাহীনতা থাকলেও তা যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ঠিক করা যায়, কিন্তু তা করা হয়নি। এর দায় সরকারের।

চলমান এসব ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) বলছে, গত বছরের (২০২৪) আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছেন।

আরেক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে গণপিটুনিতে সর্বোচ্চ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৪৬ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিন গুণ। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত ৫ আগস্টের পর ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সরকার তা বন্ধ করতে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। কখনো কখনো কাউকে জোর করে কোনো পদ থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে ‘মবের’ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বেড়েছে এসব মবকেন্দ্রিক সহিংসতা বা গণপিটুনি।

পুলিশের তথ্য বলছে, ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার (ছিনতাই) ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪৫টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। ডাকাতি ও দস্যুতা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও বেড়েছে। দেশে গত জানুয়ারিতে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি।

গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হত্যাকারী হিসেবেই চিহ্নিত হন, এমনটাই মত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি এবং আমলাতন্ত্রকে পরিচালনায় অদক্ষতাই গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular