মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ : একসময় পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত সেন্টমার্টিন দ্বীপ। পর্যটন মৌসুমে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যস্ততা, বাজারে কেনাকাটা আর সৈকতে মানুষের ভিড়ে জমজমাট থাকত পুরো এলাকা। এখন সেই চিত্র নেই। বন্ধ হোটেল-রিসোর্ট, তালাবদ্ধ রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট। পর্যটক না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দ্বীপের অনেক বাসিন্দা।
সম্প্রতি সরেজমিনে সেন্টমার্টিনে গিয়ে দেখা যায়, জেটিঘাট থেকে বাজারপাড়া এলাকায় মানুষের চলাচল কম। একসময় ব্যস্ত থাকা অনেক দোকান ও রেস্তোরাঁ বন্ধ। কোথাও বসে আছেন কর্মহীন মানুষ, কোথাও জাল বুনছেন জেলেরা। আবার কেউ কেউ অবসর সময় কাটাচ্ছেন।
জেটিঘাট থেকে বাজারপাড়ায় ঢুকতেই ডান পাশে দারুচিনি রেস্টুরেন্ট। একসময় যেখানে খাবারের জন্য পর্যটকদের ভিড় থাকত, এখন সেখানে চলছে ক্যারাম খেলা। স্থানীয় লোকজন প্রতি গেম ১০ টাকা দিয়ে ক্যারাম খেলছেন।
রেস্টুরেন্টের মালিক সৈয়দ আমিন বলেন, ক্যারাম খেলার ব্যবস্থা করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হচ্ছে। এই আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। একসময় তাঁর রেস্টুরেন্টে ২০ জনের বেশি কর্মচারী কাজ করতেন। পর্যটক না থাকায় এখন সবাই বেকার।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যটন মৌসুম সীমিত হওয়া ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে। এতে শাহিনা রেস্তোরাঁ, আল্লাহর দান রেস্টুরেন্ট, ইউরো বাংলা, এশিয়া বাংলা রেস্টুরেন্টসহ অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় যুবক আলমগীর আকাশ বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের মানুষ এখন খুব কষ্টে আছে। পর্যটক না থাকায় রিকশা, হোটেল, রেস্তোরাঁ—সবখানেই আয় কমে গেছে।’
শাহজালাল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আগে ব্যবসা করতাম। এখন বড়শি নিয়ে সাগরে যাই। কিন্তু মাছ কিনবে এমন মানুষের সংখ্যাও কম। এভাবে চললে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’
খাদ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের আরেকটি বড় সমস্যা নৌ-যোগাযোগ। তাঁদের ভাষ্য, সাগর উত্তাল হলে ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে দ্বীপে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা ব্যাহত হয়। তখন অল্প সময়ের মধ্যেই পণ্যের সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, বৈরী আবহাওয়া বা সতর্কসংকেত জারি হলে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে দ্বীপের বাসিন্দাদের যাতায়াত বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য সরবরাহও ব্যাহত হয়।
তাঁর মতে, দ্বীপের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ খাদ্যপণ্য টেকনাফ হয়ে সেন্টমার্টিনে যায়। তাই নৌযান চলাচল বন্ধ হলে দ্বীপে দ্রুত খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিনে প্রতি মাসেই প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আলাদা খাদ্য মজুত রাখার জন্য দ্বীপে একটি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযোগাযোগ ব্যাহত হলে খাদ্য পরিবহনে সাময়িক সমস্যা হয়। তবে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে যতটা সম্ভব দ্রুত খাদ্যসামগ্রী দ্বীপে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ
দ্বীপবাসীর অভিযোগ, সেন্টমার্টিন হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে জলাতঙ্কের (র্যাবিস) টিকা নেই। দ্বীপে বিপুলসংখ্যক কুকুর থাকায় কুকুরের কামড়ের ঘটনায় চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাঁদের। একই সঙ্গে হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে র্যাবিসের টিকা নেই। বিদ্যুৎ সংকটও রয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেয়। দ্রুত র্যাবিস টিকা সরবরাহ, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং একটি সরকারি খাদ্যগুদাম স্থাপনের দাবি জানাই।’
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হোসাইন বলেন, তিনি অসুস্থ থাকায় বর্তমানে ছুটিতে আছেন। তবে তাঁর জানা মতে, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে কোনো চিকিৎসক কর্মরত নেই। সেখানে চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে।
র্যাবিস টিকার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন। শিগগির প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করার আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটও পুরোনো সমস্যা
দ্বীপবাসীরা জানান, সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ সরবরাহও অনিয়মিত। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। এতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয় তাঁদের। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাধারণ জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শোয়েব বলেন, পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় কমে গেছে। চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হলে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে যাতায়াতও সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সাগরে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে জেলেদের মাছ ধরতেও সমস্যা হচ্ছে।
দুর্যোগের ঝুঁকি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়েও উদ্বিগ্ন দ্বীপবাসী। তাঁদের আশঙ্কা, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এ কারণে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। এসব সমস্যা সরকারের নজরে এনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে দ্বীপের মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হবে।
স্থানীয়দের মতে, সেন্টমার্টিনের একটি বড় অংশের মানুষের জীবিকা পর্যটননির্ভর। ফলে পর্যটন খাতে মন্দা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাঁদের আয়ে। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, নৌ-যোগাযোগ ও দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বিষয়গুলোতেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
দ্বীপবাসীর দাবি, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।




