নিউজ ডেস্ক : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) টুইট করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির টেক্সট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত ১৪-বিন্দু চুক্তিতে সীমানার সব সামরিক সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সাথে মার্কিন জব্দকৃত অর্থের প্রাথমিক $২৪–২৫ বিলিয়ন মুক্তির বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। তবে উপর্যুক্ত সব দাবি মাধ্যমে ফাঁস করা খসড়ার ভিত্তিতে পাওয়া – এ বিষয়ে সরকারসমূহ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
সময়: জুন ১৪–১৬, ২০২৬ (চুক্তি ঘোষণা ও প্রকাশ)
মুখ্য দাবি: ১৪ ধাপের চুক্তিতে সব সম্মুখে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ খুলে দেওয়া, $২৪–২৫ বিলিয়ন অবমুক্ত
অতিরিক্ত: $৩০০ বিলিয়ন পুনর্গঠন তহবিলের প্রতিশ্রুতি (সরকারি স্বীকৃতি নেই)
পার্টি: মার্কিন ও ইরান (পাকিস্তান মধ্যস্থতা); ফাঁসখসড়ায় ইসরায়েলের উল্লেখ নেই
যাচাই: বিস্তারিত ঘোষণা হয়নি; তথ্যের উৎস লিকড খসড়া এবং মিডিয়ার প্রতিবেদন
ফাঁসকৃত চুক্তির মূল শর্তসমূহ: মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত খসড়ায় বলা হয়েছে যে যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে “সামরিক কার্যক্রম সকল সম্মুখে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে” বন্ধ করতে হবে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, প্রস্তাবিত স্বাক্ষরিত সমঝোতায় হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের উপর চলমান অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা রয়েছে। এর বিনিময়ে ইরানকে তার জব্দকৃত অর্থের তহবিল থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় $২৪–২৫ বিলিয়ন মুক্তি দিতে হবে। চুক্তির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল: মার্কিন সরকারকে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলেমিশে ইরান পুনর্গঠনে কমপক্ষে $৩০০ বিলিয়ন বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যদিও রয়টার্সের এক কর্মকর্তা বলেন, এই তহবিল হবে একটি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ব্যবস্থা – সরকারী বাজেট থেকে নয়।
তবে এসব তথ্য শুধুমাত্র ফাঁসকৃত খসড়া এবং মিডিয়া রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে। এখনও পর্যন্ত মার্কিন বা ইরানি প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে কোন অংশের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জি.ডি. ভ্যান্স পর্যন্ত জানিয়েছেন যে চুক্তি নিয়ে প্রচুর “ভুয়া তথ্য” ছড়ানো হচ্ছে এবং “কোনো তহবিল ইরানের সাথে শুধু চুক্তি সই বা আলোচনায় অংশগ্রহণের বিনিময়ে দেওয়া হবে না,” চুক্তি পূরণে পারফরম্যান্স ভিত্তিক সুবিধা আসবে। মার্কিন প্রশাসনের এক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তিটি কার্যকর হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও সংরক্ষিত ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হবে।
সরকারি প্রতিক্রিয়া: চুক্তি নিয়ে পাকিস্তান ও ইরানের কর্মকর্তারা আশাবাদী। পাকিস্তানির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এক টুইটে বলেছে, “শান্তি এখন আর কখনো এত কাছে ছিল না”। তিনি জানান, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১৯ জুন চূড়ান্ত স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, “ইসলামাবাদ চুক্তির পরিপূর্ণতা আগে কখনো এতটা কাছাকাছি ছিল না,” আর মিডিয়ায় গুজব না ছড়াতে অনুরোধ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে “ইরানের সঙ্গে আমাদের চুক্তির ব্যাপারটি এখন সম্পন্ন” এবং হরমুজ বন্ধের অবসানসহ চুক্তির সাফল্যে উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাএৎস জানিয়েছেন, তারা চুক্তিতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে বিরত রাখার শর্ত আশা করে। এছাড়া মার্কিন পক্ষ বলেছে, এই ডিল “পারফরম্যান্স-ভিত্তিক” হবে; অর্থাৎ ইরান শর্ত পূরণে অগ্রগতি না করলে কোনো অর্থ রেলিজ হবে না।
ইসরায়েল ও প্রতিবেশী প্রতিক্রিয়া: আলোচনার এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়ছে। বেশ কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী (যেমন জেরুজালেম পোস্ট), চুক্তির লঙ্ঘন খসড়ায় ইসরায়েলের কোনো উল্লেখ নেই। তবু ট্রাম্প দাবি করেছেন আলোচনায় ইসরায়েলও অংশ ছিল। তবে ইসরায়েল সরকার জানিয়েছে তারা চুক্তির খসড়া দেখার সুযোগও পায়নি। প্রাথমিক ঘোষণার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “ইসরায়েল চুক্তির শর্ত এখনও জানে না” এবং সতর্ক করেছেন যে লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে তাঁরা প্রয়োজনে বাহিনী প্রত্যাহার করবে না। সাম্প্রতিক লেবানন হামলার পর হিজবোল্লাহ জানিয়েছে, “ইসরায়েল সরে না গেলে কোন চুক্তি হবে না,” এবং পরবর্তী আলোচনায় তারা ইসরায়েলকে লেবানন থেকে প্রত্যাহারের দাবি তুলবে। ফলে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথায় ছিল, তাতে পার্শ্ববর্তী লেবানন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও পরবর্তী ধাপ: সবমিলিয়ে এ চুক্তির খসড়া বাস্তবায়ন হলে ইরান ও এর মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে বড় প্রভাব ফেলবে। হরমুজ পুনরায় খোলার ফলে বিশ্বজ্বালানি চাহিদা মেটাতে সহায়তা মিলবে। ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্র (ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি) আগামি চূড়ান্ত পারমাণবিক শর্ত পূরণে ইরানের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার অঙ্গীকার জানিয়েছে। তেমনি মার্কিন নির্বাচনী অগ্রিম প্রতিক্রিয়াও বিবেচনার বিষয়: অভ্যন্তরে কিছু রিপাবলিকান নেতারা চুক্তিকে ‘ইরানের পক্ষে’ অতিমাত্রায় উদার বলে সমালোচনা করেছেন।
প্রশ্ন: যদিও শান্তিচুক্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক কিছু জানা গেল, তবে অনেকেই সন্দিহান-এটাই কি আসল চুক্তি হবে? ফাঁসকৃত খসড়ার তথ্য কতটা সঠিক? চুক্তির শর্ত বাস্তবে স্বাক্ষরের পর প্রকাশ হবে কি? ইসরায়েল চুক্তি মানবে কী? হিজবোল্লাহ পরবর্তী অবস্থান কী হবে? মার্কিন কংগ্রেসে চুক্তি অনুমোদনের চলতি প্রক্রিয়া কী রূপ নেবে? এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে এই আলোচনা ও গুজব থেকে সাড়াশব্দ ওঠার পরিসমাপ্তি এবং চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন কেমন হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত রয়েছে। সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




