ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeনারী ও শিশুপাঠ্যবইয়ের ‘অনুশীলন’ অংশ অনুশীলন হয় না

পাঠ্যবইয়ের ‘অনুশীলন’ অংশ অনুশীলন হয় না

নিউজ ডেস্ক; সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশ শ্রেণিকক্ষে সম্পন্ন করানোর নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষক তা অনুসরণ করছেন না। বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘নিজে করি, দেখি পারি কিনা’ কার্যত চর্চার বাইরে থাকছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দেশের ২০ জেলার ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সাম্প্রতিক মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়নে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এনসিটিবির কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি পঠন (রিডিং) দক্ষতায় সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তার মুখ্য কারণ হলো পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশের বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিষয়টিকে একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষার্থীর পারিবারিক সহায়তা, মূল্যায়ন ব্যবস্থাসহ নানা বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

৪৩ বিদ্যালয়ের চিত্র
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৩৬টি পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে সম্প্রতি দেশের ২০ জেলার ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন এনসিটিবির কর্মকর্তারা। দেখা যায়, কোনো বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশ চর্চা করছে না। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দিয়ে এ অংশ সম্পন্ন করাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনো শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিকের পাঁচ বছর নিয়মিত অনুশীলন অংশ সম্পন্ন করে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে রিডিং বা লিখন দক্ষতায় বড় ঘাটতি থাকার কথা নয়। বাস্তবে সেই ঘাটতি রয়েছে। তাই শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

শিক্ষক নির্দেশিকা অনুসরণ করেন না শিক্ষকরা
প্রতিবছর শিক্ষকদের জন্য পৃথক শিক্ষক সহায়িকা বা নির্দেশিকা প্রস্তুত করে এনসিটিবি। এতে প্রতিটি পাঠ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, অনুশীলন অংশ কীভাবে করাতে হবে– এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া থাকে। প্রত্যেক শিক্ষককে একটি করে কপি সরবরাহ করা হয়। তবে মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষক এসব নির্দেশিকা অনুসরণ করেন না। অনেকেই এ ধরনের নির্দেশিকার বিষয়ে অবগত নন। এ কারণে সরকারি অর্থের অপচয় কমাতে ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নির্দেশিকা শুধু অনলাইনে প্রকাশ করে এনসিটিবি।

২২টি প্রশিক্ষণ, তবুও বাস্তবায়নে ঘাটতি
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি উন্নয়নে বিভিন্ন পর্যায়ে ২২টি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রশিক্ষণের প্রতিফলন শ্রেণিকক্ষে দেখা যাচ্ছে না।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রিডিং দক্ষতার দুর্বলতার বিষয় সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এরপর বিষয়টি নিয়ে নানা স্তরে আলোচনা শুরু হয়।

সংসদে আলোচনার পর শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণ অনুসন্ধানে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে এনসিটিবি। এ ছাড়া গত মে মাসে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের রিডিং দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

দক্ষতায় বড় ঘাটতি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট সম্প্রতি ঢাকা মহানগরের ৩৪১টি, এর বাইরে ঢাকা জেলার প্রায় ৬০০টি, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টি ও মুন্সীগঞ্জের ৬১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। এই মূল্যায়নে দেখা যায়, মাত্র ১২ শতাংশ বিদ্যালয়ের পাঠ্যমান ‘এ’ শ্রেণির। ৫২ শতাংশ বিদ্যালয় ‘বি’ এবং ৩৬ শতাংশ বিদ্যালয় ‘সি’ শ্রেণিতে রয়েছে।

বাংলা, ইংরেজি ও গণিত– তিনটি বিষয়েই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। পরিদর্শনে আরও দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ভাষার কিছু বর্ণের সঠিক উচ্চারণ করতে পারে না, যুক্তবর্ণ পড়তে সমস্যা হয়, ইংরেজি রিডিং ও মৌলিক গণিতেও দুর্বলতা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়ার দক্ষতা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি দেশের সব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন। পরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা বিদ্যালয়গুলোতে চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বই থেকে অন্তত পাঁচ পৃষ্ঠা উচ্চ স্বরে পড়াতে হবে। পাশাপাশি যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ শেখানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ভবিষ্যতে পাঠ্যবই ও ওয়ার্কবুক আলাদা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। অনেক দেশে পাঠ্যবই ও অনুশীলন বই আলাদা থাকে এবং এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এ বিষয় আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

শিক্ষাবিদরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হাফিজ আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের রিডিং দুর্বলতার জন্য শুধু অনুশীলন অংশ সম্পন্ন না হওয়াকে দায়ী করা ঠিক হবে না। সব শিক্ষার্থী একই গতিতে পড়তে পারে না। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে শেখে। তাই রিডিং দুর্বলতার মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ– সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে। এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন বলেন, পড়ার দক্ষতা উন্নয়নে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন সেই নির্দেশনার বাস্তব ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশ কেন শ্রেণিকক্ষে সম্পন্ন করানো হচ্ছে না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি রিডিং এবং মৌলিক গণিতে দক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরেই যদি পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরবর্তী শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবন পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব বহন করতে হয়। তাই পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশ অনুসরণ করা, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত শিখন মূল্যায়ন জোরদার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular