ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিবিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন (বিএসএমএ) । সোমবার (৮ জুন ২০২৬) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়। তাদের মতে সরকার এমন এক সময়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে, যখন দেশের স্টিল শিল্প ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরি। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অন্য শীর্ষ নেতারা।

সুমন চৌধুরি বলেন, স্টিল শিল্প বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ সমৃদ্ধ এই শিল্পখাত দেশের সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, আবাসন ও শিল্পকারখানা নির্মাণে অপরিহার্য কাঁচামাল সরবরাহ করে। একই সঙ্গে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সরকার প্রতিবছর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করে থাকে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে দেশের স্টিল শিল্প বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট, এলসি খালার জটিলতা, কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ সংকট এবং ক্রমবর্ধমান পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয়।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টিরও বেশি রি-রোলিং মিল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ দেশের বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

অধিকাংশ কারখানা বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি শিল্পখাতের ওপর আরও একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

তারা আরো বলেন, হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফের কারণে তিন মেট্রিক টন স্টিল উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১,৭৮৫ টাকা বৃদ্ধি পাবে। এর সঙ্গে ভ্যাট, বন্দর চার্জ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, ফেরো-অ্যালয় এবং অন্যান্য কনজিউমেবলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ৩,৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

আমরা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই যে দেশের বৃহৎ স্টিল কারখানাগুলো ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি এবং ২৩০ কেভি হাই ও এক্সট্রা হাই ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক। স্টিল মিল মালিকগন নিজস্ব অর্থায়নে সাব-স্টেশন, ট্রান্সফরমার এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ফলে এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য সিস্টেম লস, ট্রান্সমিশন লস বা ডিস্ট্রিবিউশন লস নেই। তা সত্ত্বেও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, ভ্যাট এবং অন্যান্য চার্জের মাধ্যমে শিল্পখাতের ওপর ক্রমাগত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূর্ণভাবে ভোক্তাদের ওপর স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে এর একটি বড় অংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের বহন করতে হবে।

অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে স্টিলের বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আবাসন, অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি মানেই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বৃদ্ধি। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারকেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন ব্যয়কে আরও বৃদ্ধি করবে। আমরা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। তবে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্পখাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই বা কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের স্টিল শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত এবং শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পকে দুর্বল করা মানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তিকে দুর্বল করা।

তাই দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন (বিএসএমএ) সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানাচ্ছে যে, বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে পূর্ববর্তী মূল্য হার পুনর্বহাল করা হোক।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাতকে রক্ষা করা আজ শুধু শিল্পখাতের দাবি নয়; এটি কর্মসংস্থান নিয়োগ, শিল্পায়ন এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে একটি জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular