নিউজ ডেস্ক: ২০ আগস্ট দুপুর ২টা। রাজধানী ঢাকার আকাশ ঝকঝকে রোদ। মেঘ-বৃষ্টির আভাসও ছিল না। বাড়ির ছাদে শিশুরা খেলছিল। কেউ কাপড় শুকাতে দিয়েছিলেন তীব্র রোদে। হঠাৎ বিকট শব্দ। ছাদের এক কোণে আঘাত হানে বজ্রপাত। কোনো দৃশ্যমান বিদ্যুৎ চমকানি বা বৃষ্টির লক্ষণ ছাড়াই বজ্রাঘাতের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত সবাই ছাদ ছেড়ে বাড়ির ভেতর আশ্রয় নেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের মাসুদুল আলম ভূঁইয়া (সোহাগ) নামে এক বাসিন্দার বাড়ির ছাদে এ ঘটনা ঘটে। তার ভাষ্য, ওই এলাকার অনেক ভবনে হয়তো যথাযথ বজ্রনিরোধকব্যবস্থা নেই। জনবহুল রাজধানীতে এমন ঘটনা ‘অ্যালার্মিং’ বলে মনে করেন তিনি। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
স্থানীয়রা ঘটনাটিকে ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ মনে করছেন। তবে আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, একেবারে মেঘহীন আকাশ থেকে বজ্রপাত হতে পারে। কোনো এলাকার আকাশ পরিষ্কার মনে হলেও কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা শক্তিশালী বজ্রমেঘ থেকে বিদ্যুৎ আকাশের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ অংশ পেরিয়ে মাটিতে আঘাত করতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে মেঘ না থাকলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশে বজ্রপাত নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো বৃষ্টির আগেই, কখনো বৃষ্টির মধ্যে, আবার কখনো দূরের মেঘ থেকে আচমকা বজ্রাঘাতের ঘটনা ঘটছে। এতদিন গ্রাম, হাওর ও কৃষিজমিতে বজ্রপাতের ঝুঁকি নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও রাজধানী ঢাকাসহ শহরাঞ্চলের ভবন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, ঢাকায় দ্রুত বাড়ছে বহুতল ভবন। এসব ভবনের ছাদে পানির ট্যাংক, অ্যান্টেনা, টেলিযোগাযোগের যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, লোহার কাঠামোসহ বিভিন্ন ধাতব স্থাপনা থাকে। এগুলো যথাযথভাবে বজ্রনিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত না থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পুরোনো ভবনের দুর্বল বৈদ্যুতিকব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত মাটিসংযোগ, নির্মাণবিধি না মানা এবং বজ্রনিরোধকব্যবস্থা না থাকাও বিপদ বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ভবনগুলোতেও লাইটনিং প্রোটেকশন সিস্টেম (এলপিএস) কার্যকর আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
তারা বলছেন, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ভবনের সর্বোচ্চ স্থানে উপযুক্ত বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা যেতে পারে। তবে শুধু একটি লোহার দণ্ড বসিয়ে রাখলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বজ্রের বিদ্যুৎ নিরাপদ পথে মাটিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবাহীব্যবস্থা ও শক্তিশালী মাটিসংযোগ।
তবে একতলা বাড়ি, বহুতল ভবন, কারখানা, হাসপাতাল কিংবা বিদ্যালয়–সব স্থাপনার ঝুঁকি এক নয়। ভবনের অবস্থান, উচ্চতা, আশপাশের স্থাপনা এবং বৈদ্যুতিকব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রকৌশলীর মাধ্যমে ঝুঁকি নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বজ্রপাতকে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এর পরও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বজ্রপাতে মারা যাচ্ছেন। চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন। ২৬ এপ্রিল এক দিনেই সাতটি জেলায় বজ্রপাতে মারা যান ১৪ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৮৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। বজ্রপাতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা সাধারণত বছরের বর্ষা মৌসুমে বেশি ঘটে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের তথ্যের ভিত্তিতে মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুনে দেশের মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটেছে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে কৃষকরা ধান কাটতে মাঠে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ফলে এ সময় কৃষক, জেলে ও খোলা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে। মুঠোফোন, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এসব বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ না থাকাই বড় সমস্যা। বিশেষ করে মাঠ, হাওর ও জলাশয়ে অবস্থানরত মানুষের জন্য কয়েক মিনিটের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো অনেক সময় সম্ভব হয় না। অনেক এলাকায় আবার দ্রুত পৌঁছানোর মতো পাকা আশ্রয়কেন্দ্রও নেই।
সরকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং সেখানে বজ্রনিরোধকব্যবস্থা রাখার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, হাওরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে কৃষক ও জেলেদের সুরক্ষায় একাধিক উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, সাইরেন স্থাপন, তালগাছ রোপণ এবং বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ওই দিন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, বাংলাদেশ, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় বজ্রপাতের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি–প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত ঘটে।
তিনি বলেন, বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখনো পর্যাপ্ত কার্যকর কর্মসূচি, সঠিক পরিসংখ্যান, বজ্রনিরোধক যন্ত্র বা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী বজ্রমেঘের মধ্যে বিপুল বৈদ্যুতিক চার্জের সৃষ্টি ও ভারসাম্যহীনতার কারণে বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ধরনের বজ্রঝড় তৈরির জন্য অনুকূল। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু এবং স্থলভাগের বিভিন্ন বায়ুপ্রবাহের সংঘাতে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার অস্থিরতার সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মিলিত হলে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কিন্তু ইদানীং রাজধানীতে বৃষ্টির সময় বেশি বজ্রপাত লক্ষ করা যাচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাণহানি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনে মানসম্মত বজ্রনিরোধকব্যবস্থা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, “যাকে আমরা ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ বলি, সেটি আসলে পুরোপুরি মেঘহীন আকাশ থেকে হওয়া নয়। ওই এলাকার আশপাশে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও না কোথাও মেঘ থাকতে পারে। তবে বিনা মেঘে এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল।”
মোহাম্মদপুরের ওই বাড়ির ঘটনায় তিনি বাড়ি নির্মাণের সময় সতর্ক থাকার পাশাপাশি ভবনে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের পরামর্শ দেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেঘহীন আকাশে বজ্রপাত মূলত দূরের কোনো বজ্রঝড় বা মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরেও আঘাত হানতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মোহাম্মদপুরের ওই বাড়ির ঘটনায় বজ্রনিরোধকব্যবস্থা থাকার পরও ভবনের একটি কোনায় বজ্রপাতের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিনি লাইটনিং অ্যারেস্টারের সুরক্ষা পরিধির ভুল হিসাব, ত্রুটিপূর্ণ আর্থিং কিংবা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কথা উল্লেখ করেন।
পুরোনো ভবনগুলোকে বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত লাইটনিং প্রোটেকশন সিস্টেম (এলপিএস) ও আধুনিক লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন অধ্যাপক আদিল। ছাদের অ্যারেস্টার থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ নিরাপদে মাটিতে নামিয়ে আনতে মোটা কপার বা অ্যালুমিনিয়াম কেব্ল ব্যবহার এবং ভবনের কংক্রিট বা কোনার সঙ্গে কেব্লের সরাসরি সংস্পর্শ এড়াতে উপযুক্ত ইনসুলেটর ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, পুরোনো বা অকার্যকর আর্থিংয়ের কারণে এর রেজিস্ট্যান্স বেড়ে গেলে লাইটনিং রড থাকলেও ভবনের কাঠামো বজ্রপাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই ভবনের সাধারণ বৈদ্যুতিক লাইনের আর্থিংয়ের পাশাপাশি আলাদা ডেডিকেটেড আর্থিং পিট বা বোরিং স্থাপন এবং তা নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরি।




