ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশবিনোদনকেন্দ্রের অভাব, ঈদে ‘মিনি কক্সবাজার’ হয়ে ওঠে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা পাড়

বিনোদনকেন্দ্রের অভাব, ঈদে ‘মিনি কক্সবাজার’ হয়ে ওঠে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা পাড়

নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদাতা : ঈদের ছুটিতে বিকেলের শেষ আলোয় রামগতির আলেকজান্ডার এলাকার মেঘনা পাড়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদীর বুকে ছুটে চলা ট্রলার, জোয়ার-ভাটার ঢেউ আর হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সূর্যাস্তের সোনালি আভা নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের ভিড়ে তখন মনে হয়, যেন এটি কোনো সমুদ্রসৈকত।

লক্ষ্মীপুরে মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্রের অভাব দীর্ঘদিনের। জেলার পাঁচটি উপজেলার কোথাও আধুনিক কোনো পার্ক বা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে ঈদ, সরকারি ছুটি কিংবা বিশেষ অবকাশে মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে মেঘনা নদীর তীর। বিশেষ করে সদর, রায়পুর ও রামগতি উপজেলার নদীঘেঁষা এলাকাগুলো এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে।

ঈদের দিন থেকে শনিবার পর্যন্ত মেঘনার পাড়জুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। রায়পুরের চরবংশী ইউনিয়নের আলতাফ মাস্টার ঘাট ও সাজু মোল্লার ঘাট, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর লঞ্চঘাট এবং রামগতির আলেকজান্ডার এলাকা ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। একই সঙ্গে জেলা সদরের ঐতিহাসিক দালালবাজার জমিদারবাড়ি, খোয়াসাগর দিঘির পাড় এবং রায়পুরের জ্বীনের মসজিদেও ছিল মানুষের ভিড়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রায়পুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও সেখানে এখনো কোনো স্থায়ী বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। একসময় নির্মিত শিশু পার্কটি ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতায় আদালতের মামলায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পার্কটির অবকাঠামো নষ্ট হয়ে পড়ে এবং অধিকাংশ সরঞ্জাম চুরি হয়ে যায়।

রায়পুর উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লার ঘাট ও আলতাফ মাস্টার ঘাট। সদর উপজেলা থেকে মজুচৌধুরীর লঞ্চঘাটের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। আর রামগতি উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরেই মেঘনার বিশাল জলরাশি। সহজ যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এসব এলাকা এখন দর্শনার্থীদের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

রামগতির আলেকজান্ডার এলাকায় নদীভাঙন রোধে নির্মিত সুরক্ষা বাঁধ এখন শুধু জনপদ রক্ষা করছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রও। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর আকাশের মিতালি। নদীর বুক চিরে বয়ে আসা বাতাসে মিশে থাকে এক ধরনের প্রশান্তি, যা শহুরে জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

বিকেল গড়ালে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে নদীর পাড়ে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। নদীর তীরে জেগে ওঠা বালুচর, ঢেউয়ের ছন্দ আর জলের মৃদু শব্দ দর্শনার্থীদের কাছে এনে দেয় ভিন্ন এক অনুভূতি। অনেকেই স্বল্প খরচে প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মেঘনার পাড়কে আদর্শ স্থান হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

ঈদ উপলক্ষে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে ঘুরতে এসেছিলেন চাকরিজীবী হেলাল আহমেদ। তিনি বলেন, “জেলায় ভালো কোনো বিনোদনকেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। তাই পরিবার নিয়ে নদীর পাড়ে এসেছি। প্রকৃতির এত সুন্দর পরিবেশে এসে সত্যিই ভালো লাগছে।”

খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ বলেন, “এখানে এসে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতো অনুভূতি হচ্ছে। নদীতে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখছি। ট্রলারে করে নতুন জেগে ওঠা চরে ঘুরে আসাটাও দারুণ রোমাঞ্চকর।”

শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে আসা মহসিন মিয়া বলেন, “জেলায় কোনো ভালো পার্ক নেই। তাই ঈদে শিশুদের নিয়ে যাওয়ার জায়গাও কম। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে এখানে পর্যটকদের জন্য বসার স্থান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাড়ানো দরকার।”

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক সজিব হোসেন বলেন, ভয়াবহ নদীভাঙনের সময় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আলেকজান্ডার এলাকায় সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরে সেখানে পলি জমে বিস্তীর্ণ বালুচর ও প্রাকৃতিক বেলাভূমির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, এই সৌন্দর্য সংরক্ষণের পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।

তবে আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। দর্শনার্থীদের অনেকেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে নদী ভ্রমণ করছেন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও লাইফ জ্যাকেটের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন, “আমরা ট্রলারে ঘুরেছি, কিন্তু কোনো লাইফ জ্যাকেট ছিল না। যাত্রীও ছিল বেশি। কিছুটা ভয় কাজ করছিল। তবে প্রশাসনের উদ্যোগে জায়গাটি এখন অনেক সুন্দর হয়েছে।”

ট্রলারচালক কিরণ মাঝি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার-ভাটা বুঝে চলাচল করি। নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক থাকি। এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।”

জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, “মেঘনা নদীর পাড় এখন জেলার মানুষের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নদীপথে ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রায়পুর, সদর ও রামগতির মেঘনা পাড় ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই প্রাকৃতিক সম্পদ জেলার অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

ঢাকানিউজ/নাজ/24

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular