বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে বিশেষ এক গল্প। যেখানে শুধু মাঠের ৯০ মিনিট নয়, জড়িয়ে থাকে অতীতের স্মৃতি, প্রজন্মের আবেগ, সংস্কৃতির বন্ধন এবং নতুন ইতিহাস তৈরির স্বপ্ন। এমনই এক মহারণে ৩২ বছর পর আবার মুখোমুখি হচ্ছে মরক্কো ও নেদারল্যান্ডস। শেষ ৩২-এর এই লড়াইয়ে দুই দলের সামনে লক্ষ্য একটাই, বিশ্বকাপের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তবে মরক্কোর কাছে এটি শুধু নকআউট ম্যাচ নয়, পুরোনো এক অধ্যায় নতুন করে লেখার সুযোগ।
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হয়েছিল মরক্কো ও নেদারল্যান্ডসের। অরল্যান্ডোর সেই গ্রুপ পর্বের ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ২-১ গোলে জয় তুলে নিয়েছিল। সেদিনের সেই লড়াইয়ের পর কেটে গেছে ৩২ বছর। বদলে গেছে ফুটবলের অনেক হিসাব, বদলে গেছে দুই দলের প্রজন্ম, কৌশল এবং শক্তির ভারসাম্য। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও একই প্রতিপক্ষ সামনে আসায় ফিরে এসেছে পুরোনো স্মৃতির আবহ।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ম্যাচটির ভেন্যু মন্টেরেও মরক্কোর জন্য বহন করছে বিশেষ এক ইতিহাস। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে এই শহরেই অ্যাটলাস লায়ন্সরা তাদের বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছিল। সেই আসরে মরক্কো শুধু নিজেদের সামর্থ্য দেখায়নি, বরং বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যাওয়া প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছিল। সেই স্মৃতির শহরেই এবার তারা নামছে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে।
মরক্কোর সমর্থকদের কাছে এই ম্যাচ তাই আলাদা আবেগের। ১৯৯৪ সালের সেই পরাজয়ের স্মৃতি একদিকে যেমন রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে নিজেদের ফুটবল পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করার আকাঙ্ক্ষা। অনেকের চোখে এটি হতে পারে পুরোনো হিসাব মেলানোর সুযোগ, আবার অনেকের কাছে এটি মরক্কোর নতুন যুগের আরেকটি প্রমাণ দেওয়ার মঞ্চ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মরক্কো যেভাবে নিজেদের বদলে ফেলেছে, তা ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়েছে। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে তারা বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে চমকে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাসে সেই অভিযান ছিল এক নতুন মাইলফলক। এবার সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তারা ইউরোপের আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডসের সামনে দাঁড়াচ্ছে।
মরক্কো-ডাচ লেখক ও সাংবাদিক হাসান বাহারা বলেন, “এটা দুঃখজনক যে ফুটবলের এমন দুটি সেরা দেশ নকআউট পর্বের এত দ্রুত মুখোমুখি হচ্ছে। আমি আশা করেছিলাম তারা আরও পরে খেলবে, যখন উভয় দলই নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর আরও সুযোগ পেত।”
এই ম্যাচের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে এবারের বিশ্বকাপে দুই দলের পারফরম্যান্সের কারণে। শেষ ৩২-এর একমাত্র এই ম্যাচেই মুখোমুখি হচ্ছে এমন দুটি দল, যারা গ্রুপ পর্বে সাত পয়েন্ট করে অর্জন করেছে এবং ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশের মধ্যে থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে। অর্থাৎ লড়াইটি শুধু আবেগের নয়, মাঠের শক্তির দিক থেকেও সমানে সমান।
তবে মরক্কো ও নেদারল্যান্ডসের এই সম্পর্কের গল্প শুধু ফুটবল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের সামাজিক ইতিহাস। ১৯৬০-এর দশকে উন্নত জীবনের আশায় অনেক মরক্কোবাসী নেদারল্যান্ডসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ডাচ সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মরক্কোর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে।
এই সাংস্কৃতিক সংযোগই ম্যাচটিকে দিয়েছে অন্যরকম মাত্রা। বাহারা বলেন, “আমস্টারডামের বিভিন্ন এলাকায় ডাচ ও মরক্কোর ছেলেমেয়েরা যে রাস্তার ফুটবল খেলত, তা এক অর্থে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে গেছে। এই প্রেক্ষাপট অন্য যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচের চেয়ে এটিকে আলাদা গুরুত্ব দেয়।”
মরক্কো দলের নুসাইর মাজরাউই, সোফিয়ান আমরাবাত ও আনাস সালাহ-এদ্দিন এই গল্পের জীবন্ত উদাহরণ। তিনজনই নেদারল্যান্ডসে জন্মেছেন এবং বেড়ে উঠেছেন। পরে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা মরক্কোর জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের সেই সিদ্ধান্তই তৈরি করেছে এক অনন্য গল্প।
উট্রেখটভিত্তিক ক্রীড়া সাংবাদিক জঁ-পল রিসোঁ বলেন, “অনুভূতিটা অনেকটা ডার্বির মতো। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ এই ম্যাচে ঐক্যবদ্ধ থাকবে।”
তবে ম্যাচটিকে ঘিরে সামাজিক উত্তেজনার আশঙ্কার কথাও এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই ধরনের আবেগপূর্ণ ম্যাচকে কিছু পক্ষ ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু মাঠে নামার পর সব আলো থাকবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, কৌশল এবং জয়ের লড়াইয়ে।
গত কয়েক বছর ধরে মরক্কো ধারাবাহিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চলতি বছরে তারা আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতেছে। তাদের উন্নতির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী স্কাউটিং ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা খোঁজার পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কাঠামো।
তরুণ মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি ব্রাজিলের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কেড়েছেন এবং এই বিশ্বকাপেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। তরুণ প্রতিভা ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে তৈরি মরক্কো এখন আর শুধু অংশগ্রহণকারী দল নয়, বরং বড় কিছুর স্বপ্ন দেখা একটি দল।
তারা কাউকে ভয় পাচ্ছে না। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পুরস্কারের দৌড়ে নিজেদেরও একজন দাবিদার মনে করছে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসও নিজেদের শক্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে প্রস্তুত।
৩২ বছর পরের এই লড়াই তাই শুধুই একটি নকআউট ম্যাচ নয়। এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নতুন প্রজন্মের উত্থান এবং বিশ্ব ফুটবলের দুই ভিন্ন সংস্কৃতির এক অসাধারণ মিলনমঞ্চ।




