ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামমননশীলতা ও সৃজনশীল ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করার কৌশল

মননশীলতা ও সৃজনশীল ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করার কৌশল

মাহমুদ মীর

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল একটি জাতির মননশীলতা ও সৃজনশীল ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করার কৌশল। ‘জেনোসাইড স্টাডিজ’ (Genocide Studies) এবং ‘এপিস্টিমসাইড’ (Epistemicide)-এর প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতিভাত হয় যে, এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং একটি জাতির মননশীলতা ও সৃজনশীল ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশলগত প্রয়াস ছিল।

​বুদ্ধিজীবী নিধনের মূল লক্ষ্য ছিল সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া একটি জাতিকে মেধাশূন্য (Intellectually Paralyzed) করে দেওয়া, যাতে তারা স্বাধীনতা লাভের পরও দীর্ঘ মেয়াদে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। এটি ছিল পরাজিত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের পরাজয়ের প্রতিহিংসা।

​বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনকারী এবং বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাঁদের হত্যা করে জাতিসত্তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়।

​সদ্য স্বাধীন দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন প্রণয়ন ও সংস্কৃতি—এই সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যক্তিদের তালিকা ধরে হত্যা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশ যেন দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল নেতৃত্বের অভাবে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী-কে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর ডায়েরিতে বহু বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। তাঁর একটি মন্তব্যে এই নৃশংসতার পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়: “দি গ্রিন অব ইস্ট পাকিস্তান উইল হ্যাভ টু বি পেইনটেড রেড” (অর্থাৎ, সবুজ পূর্ব পাকিস্তানকে রক্তে রঞ্জিত করে দিতে হবে)।

​পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্দেশে তাদের সহযোগী আল-বদর(তৎকালীন শিবির) ও আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। এরা মূলত ছাত্র ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিল, যারা বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি-ঘর চিনত এবং তালিকা প্রস্তুত করতে সহায়তা করত।


​জেনোসাইড বা গণহত্যা অধ্যয়নের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিজীবী হত্যাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কে বিশ্লেষণ করা যায়:

​ক. জেনোসাইডের কৌশলগত অংশ (Strategic Part of Genocide)

​জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী, বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হয় কারন, ​বুদ্ধিজীবীরা একটি গোষ্ঠীর ‘অর্গানিক ইনটেলেকচুয়ালস’ হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা নিজস্ব জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, মতাদর্শ ও চেতনার সংগঠন করে, রাজনৈতিক ভাষা দেয় এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে। এই নেতৃত্ব নির্মূল করা জেনোসাইডের একটি প্রতিষ্ঠিত কৌশল।

​বুদ্ধিজীবীরা যেহেতু একটি জাতির জ্ঞান, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতীক, তাই তাঁদের বিনাশের মাধ্যমে কার্যত গোষ্ঠীর মননশীলতা ও সামাজিক স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

​খ. জ্ঞানজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞ বা এপিস্টিমসাইড (Epistemicide)

​’এপিস্টিমসাইড’ ধারণাটি হলো কেবল শারীরিক বিনাশ নয়, বরং কোনো গোষ্ঠীর জ্ঞান, চিন্তাধারা, সংস্কৃতি, এবং জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া।
​বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

​এটি ছিল ক্ষমতার ডিসকোর্সের বিপরীতে থাকা বুদ্ধিবৃত্তিক বহুমাত্রিকতাকে নির্মূলের এক চরম পদক্ষেপ। এর ফলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়।

​ঐতিহাসিক ও বিচারিক দলিল:-

​আন্তর্জাতিক জুরিস্ট কমিশন (ICJ), ১৯৭২: এই কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে।

​ট্রাইব্যুনালের রায়:- পরবর্তীকালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে আল-বদর ও আল-শামস নেতাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং এটি ছিল ‘সুপরিকল্পিত ও ব্যাপক মাত্রার আক্রমণ’।

​এভাবে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল শুধু হত্যা নয়, এটি ছিল একটি জাতির আত্মাকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও জ্ঞানজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞের একটি নির্মম অধ্যায়।

তথ্য সংগৃহীত

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular