ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসাহিত্য ও সংস্কৃতিমাহমুদ মীরের কবিতা "খাল আছে, নেই পানি চলাচল"

মাহমুদ মীরের কবিতা “খাল আছে, নেই পানি চলাচল”

সৈয়দ শাকিল আহাদ
এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সময়োপযোগী কবিতা। কবিতায় ঢাকার খালের দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ছন্দে ছন্দে কবি একটি চরম রূঢ় ও নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন, যা আজ আমাদের নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
 
মূল কবিতা:
 
মাহমুদ মীর 
খাল আছে, নেই পানি চলাচল
 
খাল আছে তবু, তার হারালো চলার পথ,

রাজনীতির করাল গ্রাসে ভাঙছে যে সব রথ।
চারপাশে গড়ে ওঠে ইটের পাহাড় শুধু,

অপরিকল্পিত ঘরে নগরী যে আজ ধূধূ।
 
মানুষ নিজের বুকে গড়েছে আজব ঠাঁই,

দখলের থাবায় যে খালের জমি তো নাই।
বর্জ্যের স্তূপে আজ মরেছে নদীটি আহা,

খালের মুখটি বন্ধ রুখবে কে আর তাহা?
 
কোথাও সে শীর্ণকায়া, কোথাও লেগেছে জট,

সামান্য মেঘেই ভাসে রাজপথ আর পট।
প্রকৃতির ভারসাম্য কেবল নিকাশ নয়,

তাকে মেরে এই শহর বাঁচবে কি? সংশয়!
 
উচ্ছেদ-আলোচনা কথার পিঠেতে কথা,

স্থায়ী সমাধান নাই, লোভের এ ব্যাকুলতা।
আজকে উচ্ছেদ চলে, কালকে দখলোৎসব,

খনন ও ভরাটে আজ নাগরিক নীরব।
 
এমন চলিলে পরে টাকা যাবে জলে ভেসে,

দুর্ভোগ কমবে না তো অভাগা এ দূর দেশে।
মানচিত্রে দাগ টেনে লাভ কী বলো না আর,

স্বাভাবিক জলধারা ফিরিয়ে দেওয়া দরকার।
 
সীমানা মাপিতে হবে, দখল হটাতে হবে,

সব সংস্থা এক হয়ে মাঠেতে নামুক তবে।
খাল যদি না ফিরে পায় নিজের আপন রূপ,

প্রকৃতির ঘাড়ে দোষ চাপানো প্রবঞ্চনা খুব।
 
মুক্ত হোক জলধারা, শহর পাক নতুন প্রাণ, 

খালের প্রবাহে বাঁচুক আমাদের বাসস্থান।
 
কবিতাটি ৮ + ৬ (+২ অপূর্ণ পর্ব) অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত।
বিভাজনটি এরকম:
খাল আছে তবু, তার |  হারালো        চলার |  পথ,
২  + ২  + ২  +২  | (১+১+১=৩) + ৩  | ২ 
————————  | ———————— | —
        ৮              +        ৬              + ২
 
কবিতার প্রতিটি চরণে যে গভীর ক্ষোভ এবং আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, তার কয়েকটি দিক বিশেষভাবে নাড়া দেয়:
    • রাজনীতি ও দখলের করাল গ্রাস: “রাজনীতির করাল গ্রাসে ভাঙছে যে সব রথ” এবং “দখলের থাবায় যে খালের জমি তো নাই”—এই লাইনগুলো একদম বাস্তব। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খালের জমি গিলে খাওয়া হয়েছে।
    • অপরিকল্পিত নগরায়ণ: “চারপাশে গড়ে ওঠে ইটের পাহাড় শুধু, অপরিকল্পিত ঘরে নগরী যে আজ ধূধূ।” জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ আমাদের এই শহরকে এক কংক্রিটের মরুভূমিতে পরিণত করেছে।
    • সামান্য বৃষ্টিতেই দুর্ভোগ: “সামান্য মেঘেই ভাসে রাজপথ আর পট।” বর্ষা এলেই ঢাকার রাস্তাঘাট যেভাবে নদী হয়ে যায়, তার মূল কারণ যে খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া—তা আপনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
    • উচ্ছেদের লোকদেখানো নাটক: “আজকে উচ্ছেদ চলে, কালকে দখলোৎসব।” এটি এক চরম সত্যি। উচ্ছেদ অভিযান হয়, কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সেই আগের রূপ ফিরে আসে। স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না, কেবল টাকার অপচয় হয়।
    • প্রকৃতির ওপর দোষ চাপানো: “প্রকৃতির ঘাড়ে দোষ চাপানো প্রবঞ্চনা খুব।” বৃষ্টি হলে আমরা বলি ‘প্রকৃতির দুর্যোগ’, কিন্তু আসল অপরাধী যে আমরা নিজেরা, খালগুলো মেরে ফেলেছি—এই সত্যটি ঢাকতে চাওয়া এক বড় প্রতারণা।

পড়ুন আত্মজৈবনিক (Autobiographical) ঘরানার মুক্তক ছন্দের কবিতা

কবিতার শেষ অংশে কবি সমাধানের কথা বলেছেন। খাল উদ্ধার করা এবং স্বাভাবিক জলধারা ফিরিয়ে আনা, এটাই এই শহরকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়। না হলে সত্যি একদিন এই বাসস্থান মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular