ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সংকটটি শুধু ওষুধের ঘাটতি, শয্যা সংকট, জনবল স্বল্পতা বা চিকিৎসা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নয়—বরং আরও গভীর ও বিপজ্জনক একটি বাস্তবতা হলো চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী মৃত্যু বা চিকিৎসা জটিলতাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের ওপর হামলা, জরুরি বিভাগ ভাঙচুর, অবরুদ্ধ করা, এমনকি প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসকের ওপর সংঘটিত নৃশংস হামলার অভিযোগ—যদি সত্য হয়ে থাকে—তাহলে এটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা অব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সামাজিক সহিংসতার একটি বিপজ্জনক প্রতিচ্ছবি।
একটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ হলো যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। এখানে প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি চিকিৎসা পদক্ষেপ জীবন-মৃত্যুর সীমানা নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে হৃদরোগ, স্ট্রোক, সেপসিস, বহুমাত্রিক আঘাত কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রায়শই সীমিত সম্পদ, সীমিত জনবল এবং সীমিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। কিন্তু আমাদের সমাজে একটি ভুল ও বিপজ্জনক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—“রোগী মারা গেছে মানেই ডাক্তার অবহেলা করেছে”। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই হয়তো জটিলতার এমন স্তরে পৌঁছে গেছেন যেখানে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়, তাহলে কেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে ডাকা হলো? এটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয় এবং হাসপাতাল প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সঠিক ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব বণ্টন পর্যালোচনা করা। কিন্তু এর বিচার কি জনতা করবে? কোনো ক্ষুব্ধ গোষ্ঠী কি একজন চিকিৎসককে বাথরুম থেকে টেনে এনে হত্যাচেষ্টার মতো সহিংসতা চালানোর অধিকার রাখে? আইনের শাসনের রাষ্ট্রে এর উত্তর কখনোই “হ্যাঁ” হতে পারে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—রাষ্ট্র কোথায়? প্রশাসন কোথায়? জননিরাপত্তা কোথায়?
বাংলাদেশে একটি সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও স্বজনের সমাগম ঘটে। সেখানে জরুরি বিভাগে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর হাসপাতাল সিকিউরিটি প্রটোকল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়। বহু হাসপাতালে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী নেই, পুলিশ সহায়তা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না, সিসিটিভি অকার্যকর, ভিজিটর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগী ব্যবস্থাপনায় সংকটকালীন যোগাযোগ পদ্ধতিও প্রায় অনুপস্থিত।
রাষ্ট্রের করণীয় কী—এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর নীতিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই; কঠোর, দৃশ্যমান এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১. হাসপাতাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলাকে সাধারণ মারামারির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। একটি হাসপাতালের ভেতরে সহিংসতা ঘটানোকে রাষ্ট্রবিরোধী জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অনেক উন্নত দেশে হাসপাতাল ভাঙচুর বা চিকিৎসকের ওপর হামলার জন্য বিশেষ আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও একটি “হাসপাতাল নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন সময়ের দাবি।
২. প্রতিটি জেলা হাসপাতালে স্থায়ী পুলিশ মেডিকেল সিকিউরিটি ইউনিট: যে হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসেন, সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা ইউনিট না থাকা অযৌক্তিক। প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ প্রশিক্ষিত পুলিশ মেডিকেল সাপোর্ট ইউনিট থাকতে হবে, যারা শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, হাসপাতালভিত্তিক সংকট ব্যবস্থাপনায়ও প্রশিক্ষিত থাকবে।
৩. “কোড রেড” ইমার্জেন্সি সিকিউরিটি সিস্টেম: যে মুহূর্তে হাসপাতালে উত্তেজনা, হামলা বা সহিংসতার আশঙ্কা দেখা যাবে, সঙ্গে সঙ্গে একটি “কোড রেড” সক্রিয় হবে—যেখানে পুলিশ, প্রশাসন এবং হাসপাতাল নিরাপত্তা দল তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। উন্নত বিশ্বে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু আছে।
৪. সিসিটিভি ও ডিজিটাল নজরদারি বাধ্যতামূলক করা: হাসপাতালের প্রতিটি করিডোর, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ প্রবেশদ্বার এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থানে হাই-রেজুলেশন সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফুটেজ নষ্ট বা অকার্যকর থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
৫. রোগীর স্বজন ব্যবস্থাপনা নীতি: একজন রোগীর সঙ্গে ১৫–২০ জন স্বজন হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করলে উত্তেজনা বাড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়। তাই এক রোগী–এক বা দুইজন স্বজন নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। পরিচয়পত্রভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৬. চিকিৎসাজনিত মৃত্যু পর্যালোচনার স্বাধীন মেডিকেল অডিট বোর্ড: রোগী মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে জনরোষ নয়—বরং একটি স্বাধীন মেডিকেল অডিট বোর্ড ঘটনার মূল্যায়ন করবে। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের অবনতি কমবে।
৭. স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মানসিক সুরক্ষা ও ঝুঁকি প্রশিক্ষণ: বাংলাদেশের চিকিৎসক ও নার্সরা চরম মানসিক চাপে কাজ করেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যু, রোগীর স্বজনদের চাপ এবং হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। তাদের জন্য ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, ডি-এসকেলেশন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রশিক্ষণ জরুরি।
আজ প্রশ্ন শুধু একজন চিকিৎসকের ওপর হামলা নয়; প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি হাসপাতালকে নিরাপদ রাখতে পারছে?
একজন চিকিৎসক যদি ভয় নিয়ে কাজ করেন—“রোগী মারা গেলে আমাকে মারধর করা হবে”—তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাবে। তরুণ চিকিৎসকেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে চাইবেন না, জটিল রোগী নেওয়ার সাহস হারাবেন, আর শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে হাসপাতাল হওয়া উচিত সর্বোচ্চ নিরাপদ স্থান—যেখানে মানুষ জীবন বাঁচাতে আসে, প্রতিশোধ নিতে নয়। চিকিৎসায় ভুল হলে তদন্ত হবে, গাফিলতি হলে বিচার হবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শরীয়তপুরের ঘটনা—যদি অভিযোগ অনুযায়ী ঘটে থাকে—তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ওয়েক-আপ কল। এখনই যদি হাসপাতাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে চিকিৎসক সংকট, জনআস্থা সংকট এবং স্বাস্থ্যখাতের অচলাবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
রাষ্ট্রের কাছে আজ জাতির প্রশ্ন—হাসপাতাল কি নিরাপদ থাকবে, নাকি তা জনরোষের উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে?




