নিউজ ডেস্ক: হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছিলেন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই বৈঠকে দেশটির যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান যে, ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডনেও এসে পড়তে পারে।
হোয়াইট হাউসে সেই বৈঠকে নিজের বক্তব্যে যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথ আরও জানান, সম্প্রতি দিয়েগো গার্সিয়ায় ব্রিটিশ-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যবর্তী ভারত মহাসাগরে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া। দেখতে অনেকটা ‘সুইমিং পুলের’ মতো। গত ২০ মার্চ সেখানে ব্রিটিশ ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
সেগুলোর একটি মাঝপথে ভেঙে পড়ে, অন্যটিকে আকাশে ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেই সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়।
দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে, ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ব্রিটিশ সরকার নিশ্চিত করে বলেছে যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বহু দূর যেতে পারে তা সুদূর দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ইঙ্গ-মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ‘এবারই প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এত দূর পৌঁছালো’।
এর আগ পর্যন্ত কেউই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে এমনটি ভাবতেও পারেননি। কেননা, ইরানের শাসকরা বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাল্লা নিজেরাই ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে বলেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার বিষয়ে তাদের জোটের পক্ষ থেকে কিছুই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে যে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তেহরান ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, তেহরান থেকে দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার হলে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের দূরত্ব ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দূরত্ব ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার ও যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের দূরত্ব ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।
সেই হিসাবে ইউরোপের অনেক দেশের রাজধানী যে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় তা অনেকটাই নিশ্চিত করে বলা যায়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, ব্রিটিশ সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স রিভিউয়ে জানানো হয়েছে দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুব জোরালো নয়।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) জ্যেষ্ঠ ফেলো সিদ্ধার্থ কাউশাল বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানের মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কথা চলমান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই জানা যাচ্ছিল।’ তবে তিনি মনে করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ‘লন্ডন পর্যন্ত’ পৌঁছাতে পারে।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এএনএ করপোরেশনের গবেষক ডেকার এভিলেথ এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করে বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় অনেক অজানা কিছু থাকতে পারে।’
গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান সিবিললাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জাস্টিন ক্রাম্প বিবিসিকে বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে চমক দিতে সক্ষম ইরান।’ ইরানি বাহিনীর ক্ষমতা অনেক কমে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের আবাসন ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী স্টিভ রিড স্কাই নিউজকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিবেচনায় নিলে যুক্তরাজ্য এখনো পর্যন্ত নিরাপদ। আগামীতেও নিরাপদ থাকবে।’
বিশ্লেষকদেরও অনেকের বিশ্বাস ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডন পর্যন্ত আসতে অনেকগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে হবে। কেননা, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত।
তবে ইরানের মধ্যম-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা সে বিষয়েও কারো পরিষ্কার ধারণা নেই।
রুসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিদ্ধার্থ কাউশালের মতে, ইরানের দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দরকার হতে পারে যদি দেশটি পরমাণু বোমা তৈরি করে। তেহরানের শাসকরা পরমাণু বোমা না বানানোর রাষ্ট্রীয় নীতির কথা ক্রমাগত বলছে। অন্যদিকে, ইরান পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টা করছে বলে ক্রমাগত অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা।
তবে লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনসহ ইউরোপের বড় বড় শহরগুলো ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ঠিক কতটা শঙ্কিত তা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ উদ্যোগের মাধ্যমে হয়ত বোঝা যাবে।



