মোশতাক আহমেদ
নিউজ ডেস্ক : বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক যুবদল নেতার জামিন আবেদনকে কেন্দ্র করে আদালতের এজলাস ও বিচারকের খাসকামরা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা বিচারককে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ আখ্যায়িত করে দাবি করেছেন, তিনি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করায় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ করেছেন। গত রোববার দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষ এবং যুগ্ম জেলা জজ মো. উজ্জ্বল মাহমুদের খাসকামরায় এ ঘটনা ঘটে (৯ আগস্ট ২০২৬)।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা একটি মামলায় হাজিরা দিতে দলের নেতাকর্মীরা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যান। সে সময়ে আদালতে বিদ্যুৎ ছিল না। দুই ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থেকে ঘেমে নেয়ে উঠছিলেন সবাই। এই অবস্থায় আদালতের শুনানি শেষে বিচারক বলেছিলেন, ‘দুই ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই। আগেই তো ভালো ছিল’। ব্যস, আর যায় কোথায়! বিএনপি নেতাকর্মী বিক্ষোভ শুরু করেন এবং বিচারককে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
জজ সাহেবের অপরাধটা নিঃসন্দেহে গুরুতর! এক পীরের দরগায় গিয়ে অন্য পীরের নাম নিতে নেই। এমনকি আকার-ইঙ্গিতেও না। কথাটা বোধ করি তিনি জানতেন না। বিশ্বাস করি, তিনি আইনশাস্ত্রে পণ্ডিত। না হয় তো জজ হওয়ারই কথা না। কিন্তু দর্শনশাস্ত্রের ‘স্থান ও কাল’ বিষয়ে তাঁর আরও জানাশোনা প্রয়োজন। অন্যথায় তিনি কীভাবে বলেন– ‘আগেই তো ভালো ছিল’!
জজ সাহেব হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, এই দেশে আমরা শুধু বিশেষ সময়ে ভালো থাকি– তার আগেও না, পরেও না। ভালো থাকার সহি ও শুদ্ধ বিবরণ লেখা থাকে ইতিহাসের পাতায়। এই দেশের ইতিহাসে আমরা ‘আগে’ কখনোই ভালো ছিলাম না।
বিদ্যুতের কথা বললে অবশ্য মানতেই হবে, হারিকেন আর কুপি বাতির আমলে কোনো লোডশেডিং ছিল না। গরমে ঘেমে উঠলে বাতাস করার জন্য বাঁশের কিংবা তালপাতার পাখা তো ছিলই। এটি ছিল খুবই স্বাস্থ্যসম্মত। নিয়মিত বিরতিতে হাতের ব্যায়াম হতো; শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ত। মাঝখানে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ ক্ষতিই করেছে। এখন মানুষ হাত নাড়াতে চায় না। অন্যদিকে, রাস্তাঘাট হওয়ার ফলে মানুষ এখন আর হাঁটতেও চায় না। আধা কিলোমিটার দূরে যেতে হলে আধাঘণ্টা অপেক্ষা করে রিকশার জন্য। তাই এ কথা বলার কোনো কারণ নেই– আমরা আগে ভালো ছিলাম।
জানি না, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জজ সাহেব বিদ্যুৎ নিয়ে যে কথাটা বলেছিলেন, তা শুধু ওই জেলার অবস্থা দেখে, নাকি সারাদেশের অবস্থা দেখে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারাদেশ থেকেই লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ১০ আগস্ট দেশে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে, ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের দাবিতে মানুষ বিক্ষোভও করেছে। কিছুদিন আগেই টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার ও মির্জাপুর উপজেলায় বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। এ ছাড়াও বরগুনা, ঢাকা জেলার দোহারসহ দেশের আরও অনেক জায়গা থেকেই বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।
সমস্যা এতটাই প্রকট আর প্রকাশ্য যে, এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এও মানতে হবে, লোডশেডিং আধুনিক জীবনেরই অংশ। তাই বলতে হবে, ভালো আছি। কিছুতেই বলা যাবে না– আগেই ভালো ছিলাম। কারণ সেই ‘টাইম অ্যান্ড স্পেস’।
কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী বলেছিলেন, গ্রামে প্রকৃত অর্থে কোনো লোডশেডিং নেই। পল্লী বিদ্যুতের লাইন অনেক দীর্ঘ হওয়ায় কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করতে সময় লাগে। এ কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে লাইন ঠিক হলে আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যায় (বিডিনিউজ, ৫ মে ২০২৬)।
মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে সত্যি খুব আশান্বিত হয়েছিলাম। কারণ আমাকে কিছুদিন পরপরই গ্রামে যেতে হয়। কিন্তু অনেক সময়ই বিদ্যুতের দেখা পাই না। ভাবলাম, মন্ত্রী মহোদয় যখন বলেছেন, অবস্থার নিশ্চয় উন্নতি হয়েছে। এই তো গত সপ্তাহে নেত্রকোনার বারহাট্টায় গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তিন দিন ছিলাম। ৭২ ঘণ্টায় সাকল্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুতের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। অবস্থাটা এমনই, বাড়িতে আমার একটা আইপিএস আছে, সেটিও চার্জের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে একটা কাজ ভালো হয়েছে। বাড়িতে পুরোনো দিনের একটা বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি হাতপাখা ছিল। অনেক দিন পর সেটি ব্যবহার করলাম। ভালোই লাগল। কখন যে হাতপাখার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরও পেলাম না। নিশ্চয় ভালো আছি। নাহলে তো ঘুমুতেই পারতাম না।
আসলেই আমরা আগের তুলনায় ভালো আছি। কিন্তু নানাবিধ মানসিক কারণে আমরা বুঝতে পারি না, আমরা ভালো আছি। এই যেমন আজ সকালে গিয়েছিলাম কাঁচাবাজারে। গিন্নির শখ হয়েছে, শোল মাছ দিয়ে লাউ রান্না করবেন। বাজার থেকে ধনেপাতা আনতে বললেন। ভাবলাম, একটা তরকারিতে কতটুকুই বা ধনেপাতা লাগবে! বেশি আনলে ঘরে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। তাই দোকানিকে বললাম ১০ টাকার ধনেপাতা দিতে। তিনি সরাসরি জানিয়ে দিলেন, ১০ টাকার ধনেপাতা বিক্রি হয় না। কী আর করা! ২০ টাকার পাতা নিয়ে এলাম। কাঁচামরিচের একই অবস্থা। ৪০ টাকা দিয়ে ১০০ গ্রাম নিয়ে বাসায় ফিরলাম। গুনে দেখলাম, ৪০টার বেশি হবে না।
তারপরও বলব, ভালো আছি। কারণ এই যে জিনিসপত্রের নাম বাড়ছে, তাতে তো মানুষের ভালোই হচ্ছে। আগে শুধু শুধু বেশি জিনিস কিনে ফ্রিজ ভরে রাখত। এখন মানুষ মিতব্যয়ী হওয়া শিখছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টি স্বাস্থ্য সহায়কও বটে। এই যেমন ধরুন, মাংসের দাম বাড়ছে। এটি খুবই ভালো খবর। কারণ বেশি মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; কোলেস্টেরল বাড়ে।
আসলে সেই যে সত্যজিৎ রায় অনেক আগে সিনেমায় বলে গিয়েছিলেন– ‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’! এখন হয়তো বলা যায়– ‘লোডশেডিংয়ে নাহি খেদ, বেশি বিদ্যুতে বাড়ে রেট’!
কিছু মানুষ অবশ্য এতকিছু বুঝতেই চায় না। বলে কিনা, আগেই ভালো ছিলাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জজ সাহেব কি তাদের দলে?
মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক, সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা



