নিউজ ডেস্ক : দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বনায়নের কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাড়ে ৩ একরের কম আয়তনের অখণ্ড, অব্যবহৃত ও নিষ্কণ্টক জমির হিসাব চাওয়া হয়েছে। জমির দাগ, খতিয়ান নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এ জন্য সময় দেওয়া হয়েছে তিন কর্মদিবস।
জমির তথ্য চাওয়ায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত সম্পদকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তবে জমি চিহ্নিত করার পর সেটি কোন প্রক্রিয়ায় সোলার প্রকল্পে যাবে; প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন কীভাবে হবে; উৎপাদিত বিদ্যুৎ কোথায় ব্যবহার হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে বিবেচনা করা হবে–এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ হয়নি।
রোববার মাউশির সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে মাউশির আওতাধীন কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইচএসটিটিআই) ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জমির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে অব্যবহৃত ও নিষ্কণ্টক জমির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রয়োজন রয়েছে, এমন জমি যাতে কোনোভাবেই বাদ না পড়ে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।’
নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভা
জানা গেছে, মাউশির এ উদ্যোগ হঠাৎ নেওয়া হয়নি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে পাঠানো স্মারক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সভার কার্যবিবরণীর ভিত্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তাগিদপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন অব্যবহৃত জমি নিয়ে সভা হয়। সেখানে সাড়ে ৩ একরের কম আয়তনের অব্যবহৃত সরকারি জমি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। এসব জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণ কাজে ব্যবহারের বিষয়টি সভায় আলোচনা করা হয়।
জানা গেছে, শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জমি নয়; বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অধীনে থাকা ছোট আকারের অব্যবহৃত জমিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির তালিকা করা হচ্ছে।
‘খালি জমি কাজে লাগানো দরকার’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকারি অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে জমির অবস্থান ও গ্রিড সংযোগের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু জমির আয়তনের ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া হলে প্রত্যাশিত সুফল না-ও পাওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে একই সঙ্গে জমির ব্যবহার নিশ্চিত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে প্রকল্প নেওয়ার আগে জমির অবস্থান, সূর্যালোক, গ্রিড সংযোগ, উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার; সবকিছু অর্থনৈতিকভাবে যাচাই করা জরুরি।’
জমি পড়ে থাকছে বছরের পর বছর
মাউশির সরকারি কলেজ শাখার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক জমি বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকার নজির রয়েছে। কোথাও মূল ক্যাম্পাসের বাইরে জমি রয়েছে, কোথাও ভবিষ্যতে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় জমি খালি রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি থাকলেও অর্থ সংকট বা পরিকল্পনার অভাবে তা ব্যবহার করা যায়নি। এখন এসব জমিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে ‘অব্যবহৃত’ জমির সংজ্ঞা নির্ধারণের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। খালি জমিতে আগামী কয়েক বছরে একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, খেলার মাঠ কিংবা শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনা করেই জমি নির্বাচন করতে হবে।
একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জানান, জমির দাগ-খতিয়ানসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের জন্য মাত্র তিন কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এ সময় যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির দলিল ও রেকর্ড অনেক ক্ষেত্রেই পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন, নামজারি, রেকর্ড সংশোধন বা সীমানা পরিবর্তনের ঘটনা থাকতে পারে। কোনো জমি বাস্তবে দখলমুক্ত থাকলেও ভূমি রেকর্ডে অন্য কোনো জটিলতা থাকতে পারে। আবার কাগজে নিষ্কণ্টক জমি; বাস্তবে দখল বা ব্যবহারাধীনও হতে পারে।
বনায়নে গুরুত্ব
অব্যবহৃত জমির সবটুকুই সোলার প্রকল্পে ব্যবহার হবে না। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব জমির একটি অংশ বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিতে পরিকল্পিত বনায়ন হলে পরিবেশগত সুফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।



