মোঃ জহিরুল সানী, বগুড়ার শেরপুর থেকে ফিরে : বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ১০ নম্বর শাহবন্দেগী ইউনিয়নের শেরুয়া এলাকায় ফরেস্ট সংলগ্ন সরকারি খাল ও বন বিভাগের জমি দখল করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি ও খালের অংশ ভরাট করে দোকান, গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে একদিকে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে এলাকায় চরম জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, স্থানীয় শাহানা, আবুল, সুমন, শুভসহ কয়েকজন ফরেস্ট সংলগ্ন সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণ করেছেন এবং খালের অংশ ভরাট করে গাড়ি রাখার স্থান তৈরি করেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমল থেকেই খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাটের প্রবণতা শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত করে দুই পাশে দোকান ও গ্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। খালের মধ্যবর্তী অংশে বিভিন্ন স্থান থেকে এনে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। ফলে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী আফরোজা বলেন, খালের পানি ঠিকমতো প্রবাহিত না হওয়ায় বৃষ্টি হলেই তার বাড়িসহ আশপাশের এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে এবং কয়েকদিন পর্যন্ত নোংরা পানি উঠানে জমে থাকে। ময়লা-আবর্জনার কারণে এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, যা বসবাসের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। তিনি আরও জানান, মশা-মাছির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন বিভাগের সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণ ও সেগুলো ভাড়া দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। পাশাপাশি সড়কের পাশের সরকারি জমিও দখল করে স্থাপনা নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়া হলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অন্যরাও একইভাবে খাল ও সরকারি জমি দখলে উৎসাহিত হচ্ছে।
শেরুয়া ফরেস্ট এলাকার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একসময় এই খাল এলাকাটির প্রধান পানি নিষ্কাশনের পথ ছিল। কিন্তু দখল, ভরাট এবং অবৈধ স্থাপনার কারণে এখন এর স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারা দ্রুত খাল ও বন বিভাগের জমি দখলমুক্ত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানান।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শেরপুর ফরেস্ট এলাকার বাসিন্দা শাহানা জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের আমল থেকেই ফরেস্টের পাশের জায়গাটি ভরাট করে দখল করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবুল, সুমন, শুভসহ আরও কয়েকজন আগে নির্মিত দোকানগুলো নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে ব্যবহার শুরু করেন। তারও সেখানে একটি দোকান রয়েছে। তিনি স্বীকার করে বলেন, দোকানটি অবৈধভাবে নির্মিত। তিনি জানান, শুরু থেকেই এসব দোকান সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে সবাই একসঙ্গে না সরালে তা সম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় জনগণ ও ইউএনও ব্যবস্থা নিলে তিনি সবার আগে তার দোকান সরিয়ে নেবেন। তিনি আরও বলেন, এসব দোকান নির্মাণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে, তবে অন্যরা দখল করায় তিনিও বাধ্য হয়ে কিছু অংশে দোকান করেছেন।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলার ১০ নম্বর শাহবন্দেগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কালাম কাজী জানান, বিষয়টি তার দুই থেকে তিন দিন আগে নজরে এসেছে। যারা জায়গাটি দখল করেছে, তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি অবশ্যই বেআইনি দখল। তিনি আরও জানান, দখলদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জায়গাটি দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, বগুড়া—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমুর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




