নিউজ ডেস্ক: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে তিনি এসব তথ্য জানান। তবে কমিটির এই উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মতবিরোধ।
সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠক বর্জন করেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। একই দিনে জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। তাদের দাবি, সংসদীয় সংশোধন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর করে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বৈঠক করে ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ এবং রিপোর্ট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত করা হবে। এরপর আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধনী বিল সংসদে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি দল সরাসরি প্রতিনিধি পাঠিয়েছে, একটি দল লিখিত বক্তব্য দিয়েছে এবং আরেকটি দল শেষ মুহূর্তে উপস্থিত হতে না পারলেও টেলিফোনে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল বৈঠকে অংশ নেয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, শহিদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সনদের বাইরে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রস্তাব থাকলে সেগুলো লিখিতভাবে দিলে কমিটি তা পর্যালোচনা করবে।
কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি অর্থবছর পরিবর্তন এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ও তুলে ধরেন। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ করার জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হতে পারে। একই সঙ্গে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
বিশেষ কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে যান রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। তার বক্তব্য, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো বিষয় সাধারণ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ প্রয়োজন।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এর প্রতিবাদ জানাতেই তারা বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।
এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। গণভোটে জনগণ শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সংস্কারের বিষয়ে মত দেয়নি; সংস্কার বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকেও অনুমোদন দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করার সুযোগ এখনো রয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ করিয়ে পরিষদের অধিবেশন ডাকা সম্ভব।
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর এবং সংস্কার পরিষদকে সক্রিয় করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
ফলে একদিকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট চূড়ান্ত করে সংশোধনী বিল সংসদে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশেষ কমিটি, অন্যদিকে সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশের আপত্তি সামনে এসেছে। এই মতপার্থক্যের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে রাজনৈতিক আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




