জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসেনানী এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির অকাল মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আজ রোববার (২১ ডিসেম্বর, ২০২৫) সকালের প্রথম আলো ফুটতেই তার কবরে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে শায়িত হাদিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছেন তার সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ।
সকাল থেকেই মানুষের ঢল: শোকাতুর পরিবেশ
ফজরের নামাজের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় হাদির কবরের চারপাশ এক নীরব ও শোকাতুর পরিবেশে রূপ নেয়। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছেন, কেউবা অশ্রুসিক্ত চোখে দুহাত তুলে মোনাজাত করছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের সহযোদ্ধারা ভোর থেকেই কবরের পাশে অবস্থান নেন। তাদের চোখে জল আর হৃদয়ে বিপ্লবের সেই চেতনা, যা হাদি নিজের কণ্ঠে ধারণ করতেন। সহযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, “হাদি ভাই শুধু একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের সাহস। রাজপথের প্রতিটি লড়াইয়ে তাকে আমরা সামনে দেখেছি। তাকে এভাবে হারিয়ে ফেলব, তা ভাবতেও পারিনি।”
নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা ও বিচার দাবি
সকালে হাদির কবর জিয়ারত করতে আসেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জিয়ারত শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “হাদিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলত। বিপ্লবীদের খুন করে বিপ্লবের চেতনা দমানো যায় না। যারা হাদিকে হত্যা করেছে, তারা মূলত দেশের শত্রু।” তিনি অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, গতকাল শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে হাদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছিলেন।
সাধারণ মানুষের ভালোবাসা
কেবল সহযোদ্ধা বা রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই নন, হাদির কবর জিয়ারত করতে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন সাধারণ মানুষও। অনেক রিকশাচালক ও পথচারীকেও দেখা গেছে রিকশা থামিয়ে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা শাহিন ইসলাম নামের এক যুবক বলেন, “হাদি ভাইয়ের কথা শুনলে রক্ত গরম হয়ে যেত। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেন বলেই তাকে প্রাণ দিতে হলো। আমরা তার এই ত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।”
এক অকুতোভয় বিপ্লবীর চিরবিদায়
শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে আজ সারাদেশে শোকের আবহ বিরাজ করছে।
সকালের আলো যত বেড়েছে, কবরের পাশে মানুষের ভিড় তত দীর্ঘ হয়েছে। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বিপ্লবীর শেষ শয্যা। সাধারণ মানুষের দাবি একটাই—হাদির খুনিদের যেন দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। শহীদ হাদি হারিয়ে গেলেও তার রেখে যাওয়া ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবে, এমনটাই মনে করছেন উপস্থিত জনতা।



