নিউজ ডেস্ক : আধুনিক সমাজে এমন এক বাস্তবতা নীরবে বাড়ছে যা একে ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’ বলে ডাকা হচ্ছে। একদিকে ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার দায় ও অন্যদিকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা–দুটি প্রজন্মের দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে গিয়ে মধ্যবয়সী মানুষদের জীবন যেন দুই পাউরুটির মাঝখানে চাপা পড়ে থাকে।
পিউ রিসার্চের জরিপে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৩% প্রাপ্তবয়স্ক এই অবস্থায় পড়েছেন এবং ৪০–৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৪% তাদের বৃদ্ধ বাবা-মা (৬৫+) ও সন্তানেরই দেখাশোনা করছেন। উল্লেখযোগ্য, sandwich generation-এর প্রায় ৩৮% বলেছে যে বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তান—উভয়ই তাদের কাছেই আবেগগত সহায়তার জন্য নির্ভর করে। অর্থাৎ তথ্য বলছে, পশ্চিমা সমাজে মধ্যবয়সীরা এই দুই প্রজন্মের বোঝা একসঙ্গেই সামলাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই শব্দটি নতুন হতে পারে, বাস্তবতা একই কঠিন। দেশের বহু শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মা এবং সন্তানের যত্নই এক কাঁধে এসে পড়ছে। সামনের কয়েক দশকে দেশটির বৃদ্ধ জনসংখ্যা বিপুল হারে বাড়বে: ২০৫০ সালে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের মানুষের সংখ্যা ৩৬ মিলিয়ন (সম্প্রতি ১৩.৮ মিলিয়ন থেকে) বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২% হবে। কিন্তু দেশে এখনো সুস্থ ভাবে বৃদ্ধ-বয়ষ্কদের দেখাশোনা করার কাঠামো নেই, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি (প্রায় ৯.৯২%) ও দ্রুত চলমান জীবনধারা দুই প্রজন্মের যত্ন নেওয়া কঠিন করে তুলেছে। ফলে একদিকে বাড়তি দায়িত্ব, অন্যদিকে সংকুচিত পরিবার এবং অর্থনৈতিক চাপে বহু পরিবারে একজন মানুষই দুই প্রজন্মের বোঝা কাঁধে নিয়েছেন।
এ বোঝা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক ও আর্থিকভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, স্যান্ডউইচ প্রজন্মের মানুষ আর্থিক চাপ অনুভবের সম্ভাবনা দ্বিগুণ এবং মানসিক উদ্বেগের মাত্রা অনেক বেশি। দিনে দিনে পরিবার-পরিচর্যা করতে করতে তারা প্রায়ই ক্লান্তি, হতাশা ও উদ্বেগে ভুগে থাকেন। বাংলাদেশে সময়ব্যবহার জরিপ দেখায় পারিবারিক যত্নের অধিকাংশ কাজই নারীদের কাঁধে পড়ে। নারীরা পুরুষের তুলনায় তিন থেকে দশগুণ বেশি সময় দিয়ে এসব কাজ করে। এর ফলে পরিবারের দেখাশোনা দিতে দিতে নিজের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
ঢাকার মিরপুরের ৪৬ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা মাহবুব হাসানের জীবন স্যান্ডউইচ প্রজন্মের বাস্তব এক উদাহরণ। দুই সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ চালানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ বাবার চিকিৎসার দায় তিনি বহন করছেন। মা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকায় প্রতিদিন অফিস শেষে হাসপাতালে ছুটতে হয় তাকে। মাহবুব বলেন, “নিজের জন্য সময়ই পাই না; সন্তানের ভবিষ্যৎ আর বাবা-মায়ের চিকিৎসার মাঝে আমি যেন হারিয়ে গেছি।” বিষয়টিতে আশ্চর্যের কিছু নেই—অনেক কর্মজীবী মধ্যবয়স্কের জীবনেও একই সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।-
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চাপ কিছুটা হলেও কমানোর উপায় আছে। যেমন পরিবারের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে sandwich generation-এর মানুষদের উদ্বেগ ভাগাভাগি করে কথা বললে মানসিক বোঝা অনেকটা লাঘব হয়। অর্থাৎ যত্ন ও বোঝা ভাগাভাগি করে নেওয়া, পরিবারে পরস্পরের সহায়তা ও মানসিক সহানুভূতি বাড়ানোই এদের নীরব সংগ্রাম থেকে মুক্তির চাবিকাঠি।
স্যান্ডউইচ প্রজন্ম কেবল একটি শব্দ নয়, আজকের সমাজের দুই প্রজন্মের আমানত—তাদের প্রতি সহানুভূতি এবং সহায়তা প্রদান আমাদের সবার দায়িত্ব।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




