সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ দিন ধরে সেবা দিলেও ন্যায্য অধিকার ও চাকরির নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত দেশের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ আউটসোর্সিং কর্মী। ঠিকাদারি প্রথার শোষণ, অনিয়মিত বেতন ও চাকরিচ্যুতির আতঙ্কের মধ্যে তাঁদের দিন কাটছে। এই বৈষম্য নিরসন ও ঠিকাদার প্রথা বাতিলের দাবি নিয়ে বাংলাদেশ আউটসোর্সিং কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাহবুবুর রহমান আনিস ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক নূর কথা বলেছেন ঢাকা নিউজ ২৪ এর বিশেষ প্রতিনিধির সাথে।
ঢাকা নিউজ ২৪: বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের সংখ্যা কত এবং তাদের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন কেমন?
মাহবুবুর রহমান আনিস: আমরা শুধু আউটসোর্সিং নিয়ে কাজ করি না; এখানে দৈনিক মজুরিভিত্তিক, হাজিরাভিত্তিক, প্রকল্পভিত্তিক এবং দাপ্তরিক কাম প্রহরীর মতো বিভিন্ন খাত মিলিয়ে আনুমানিক প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ লক্ষ কর্মচারী রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বলতে, আল্লাহর রহমতে সরকার গত ২১ সেপ্টেম্বর যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তা যদি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয় এবং প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে প্রজ্ঞাপন জারি বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয় তাহলে আমরা যারা বর্তমানে কর্মরত আছি ভালো পর্যায়ে থাকতে পারব।
ঢাকা নিউজ ২৪: আউটসোর্সিং কর্মীরা মূলত কেন বৈষম্যের শিকার হন?
মাহবুবুর রহমান আনিস: বৈষম্যের মূল কারণ হলো মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদাররা, যাদের কারণেই আমরা অবহেলিত হয়ে থাকি এবং বিভিন্ন জায়গা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়। যেমন ঠিকমতো বেতন পাওয়া যায় না অনেক সময় ৬ বা ৯ মাসের মতো বেতন বকেয়া থাকে এছাড়া আজকে চাকরি করছি তো কাল অফিসে ঢুকতে পারব কি না তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, এটাও একধরনের বৈষম্য। আমরা কোনো অপরাধ না করলেও মিথ্যা অভিযোগ ও অজুহাত দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়, যা চরম বৈষম্যমূলক।
ঢাকা নিউজ ২৪: একই প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কাজ করেও আউটসোর্সিং কর্মীরা কেন স্থায়ী কর্মীদের তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধা পান?
মাহবুবুর রহমান আনিস: রাজস্ব খাতে যারা চাকরি করেন তাঁরা যে কাজ করেন; আমরা একই পদে তার চেয়ে দ্বিগুণ কাজ করি। তবুও আমরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো ন্যায্য মূল্য পাই না। কারণ তাঁরা রাজস্ব খাতের আর আমরা আউটসোর্সিংয়ের কর্মী। আমরা যখন আউটসোর্সিংয়ের কথা বলি, তখন প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা রাজস্ব খাতের চতুর্থ শ্রেণীর একজন কর্মচারিও বলে যে ‘আপনারা আমার লোক না’। একই কাজ, একই অফিস হওয়া সত্ত্বেও এবং আমরা সেবা ও শ্রম বেশি দেওয়া সত্ত্বেও বৈষম্যের শিকার হই, কারণ আমাদের আউটসোর্সিং ঠিকাদারের লোক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
ঢাকা নিউজ ২৪: আউটসোর্সিং কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা কতটুকু আছে?
মাহবুবুর রহমান আনিস: বর্তমান সরকার গত ২১ সেপ্টেম্বর যে নীতিমালা বা নীতিমালা সংশোধন করেছে, এই জনবান্ধব ও নির্বাচিত সরকার যদি এই নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করে তবে ইনশাআল্লাহ আমরা ভালো থাকব এবং আমাদের একটি অফিসিয়াল পরিচয় থাকবে। বর্তমানে আমরা যে অফিসে চাকরি করি না কেন, আমাদের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা বা পরিচয় দিতে পারি না, আমরা একরকম পরিচয়হীন।
ঢাকা নিউজ ২৪: ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মচারীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা বা কমিশন নেয় কি?
মাহবুবুর রহমান আনিস: এটি আসলেই একটি অমানবিক কাজ। ঠিকাদাররা আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েই কাজ দেয়। বর্তমানে একটি আউটসোর্সিং চাকরি নিতে গেলে ঠিকাদাররা নূন্যতম আড়াই থেকে তিন লাখ, এমনকি সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন অথচ সরকার আমাদের বেতন থেকে ৫ শতাংশ দিলেও চাকরি দেওয়ার নামে ঠিকাদাররা দুই থেকে চার লাখ টাকা নিলেও এর কোনো কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট রাখেন না। এছাড়া ১০০ জনের নিয়োগ দিয়ে ৩০০ জনের সিভি নেওয়া এবং ৭০ জনকে চাকরি দিয়ে বাকি ৪৩০ জনের টাকা ঠিকাদারের পকেটে ঢোকানো এটি দেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি, যা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
ঢাকা নিউজ ২৪: কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ না করা কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ কতটা সত্য?
মাহবুবুর রহমান আনিস: টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য কারণ ব্যাংক থেকে বেতন দেওয়ার পরেও ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঠিকাদারের হাতে আবার সেই টাকা পৌঁছে দিতে হয়, না হলে চাকরি থাকে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সব সুবিধা পেলেও অন্যান্য ব্যাংক যেমন কৃষি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ও সোনালী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের আউটসোর্সিং কর্মীরা ১০ বা ১২ হাজার টাকা বেতন পান। একই দেশে একই জায়গায় দুই নিয়ম চলতে পারে না।
ঢাকা নিউজ ২৪: কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, ছুটি, উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অবস্থা কেমন?
নুরুল হক নূর: আমরা ২০১৫ সালের নীতিমালা হওয়ার পর থেকেই উৎসব ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনো কিছুতেই অন্তর্ভুক্ত নই। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে বা ছুটি শেষে এসে দেখা যায় চাকরিও নাই, বেতনও নাই। উল্টো আমাদের বছরে ৩৬০ দিনই ডিউটি করতে হয় যা চরম বৈষম্য।
ঢাকা নিউজ ২৪: দীর্ঘদিন একই পদে কাজ করার পরও আউটসোর্সিং কর্মীদের চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
নুরুল হক নূর: আপনারা জানেন মাস্টাররোলে চাকরি করলেও রাজস্ব খাতে যাওয়ার একটি আইনি রাস্তা বা সময়সীমা থাকে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ১৪ বছর চাকরি করার পরও চাকরি স্থায়ী হয় না এবং চাকরির কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
ঢাকা নিউজ ২৪: আপনারা কেন ঠিকাদার প্রথা বাতিল বা সংস্কারের দাবি করছেন?
নুরুল হক নূর: ঠিকাদারি ব্যবস্থা হলো রাষ্ট্রের একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ৫ থেকে ৬ লাখ আউটসোর্সিং ও প্রজেক্টের কর্মচারীকে দীর্ঘদিন ধরে শোষণ করার মাধ্যম। এই শোষণ থেকে মুক্তি দিতে এবং শ্রমিকদের নায্য অধিকার শতভাগ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই আমরা ঠিকাদার বাতিলের আন্দোলন করছি। বর্তমান মানবিক সরকার সেই পথে হাঁটছেন আমরা আশা করি সফল হব। আমাদের স্পষ্ট বার্তা, যতদিন ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা বেঁচে থাকবে, ততদিন আমাদের কল্যাণ পরিষদের লড়াই চলবে।
ঢাকা নিউজ ২৪: আপনাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কী কী দাবি জানানো হয়েছে?
নুরুল হক নূর: আমাদের মূল দাবি ছিল—বেসরকারি ঠিকাদার প্রথা বাতিল করে স্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং পরবর্তীতে বয়স শিথিল করে সবাইকে আত্মীকরণ নীতিমালা অনুযায়ী স্থায়ী করা। এর সাথে আমাদের অন্যান্য ভাতাসমূহ যেমন বাসাভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও টিফিন ভাতা সম্পৃক্ত ছিল। মূলত ঠিকাদার প্রথা বাতিল করেই শ্রমিকদের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবন নিশ্চিত করার মূল দাবিতেই আমরা সোচ্চার রয়েছি।
ঢাকা নিউজ ২৪: ২০১৮ সালের নীতিমালা বাতিল করে ২০২৫ সালের নীতিমালা করার ক্ষেত্রে আপনাদের সংগঠনের এবং আপনাদের ভূমিকা কেমন ছিল?
নুরুল নুরুল হক নূর: ২০১৮ সালে আমরা এই সংগঠনটি তৈরি করার পর থেকে সংগ্রাম করে যাচ্ছি । আমাদের সম্মানিত সভাপতি মাহবুবুর রহমান আনিস ভাই আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছে। সারা দেশের আউটসোর্সিং কর্মী ও কল্যাণ পরিষধের অসামান্য অবদানের কারণেই আজ নীতিমালায় পরিবর্তন এসেছে। সবার সম্মিলিত রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে এবং প্রশাসনের সাথে ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমেই আজকের এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।



