অর্থনীতি ডেস্ক: দেশে তীব্র গ্যাসসংকট ও ব্যয়বহুল আমদানি করা জ্বালানির পটভূমিতে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝোঁকার বড় উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি প্রতিনিধি কনফিডেন্স পাওয়ার।
কক্সবাজার, বাগেরহাট ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মোট ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের রূপরেখা ঘোষণা করেছে তারা।
এই মেগা প্রকল্পের একটি অংশ অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজার থেকে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইপিও-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে তোলা অর্থের সিংহভাগ, অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নতুন জমি কেনা এবং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করবে প্রতিষ্ঠানটি।
বাকি ১৫ শতাংশ ব্যবহার করা হবে আগের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে এবং ২ শতাংশ অর্থ আইপিওসংশ্লিষ্ট খরচ বাবদ রাখা হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির একক সম্পদের পরিমাণ ৫১৬৩ কোটি টাকা।
বগুড়া, রংপুর ও চট্টগ্রামে ফার্নেস তেলচালিত নিজস্ব ৩৯৩ মেগাওয়াটের সফল বিদ্যুৎকেন্দ্র সামলানোর পর এবার পরিবেশবান্ধব গ্রিন এনার্জি বা সোলার প্যানেলে ব্যবসার বড় বৈচিত্র্য আনতে চলেছে নবগঠিত এই কনসোর্টিয়াম।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইমরান করিম বগুড়া ও রংপুরের সবুজে ঘেরা বিদ্যুৎকেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শনকালে জানান, দেশে গ্যাসের সংকট শিগগিরই মিটবে না। তাই আরও অনেক দিন বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তরল জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর ভরসা করতে হবে।
তবে বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে কনফিডেন্স পাওয়ারও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দরপত্রে অংশ নিয়ে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার। এর মধ্যে কক্সবাজার ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে তারা।
বাগেরহাটের মোংলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে যৌথ অংশীদার হিসেবে আছে বিদ্যুৎ খাতের আরেক পুরোনো কোম্পানি ডরিন পাওয়ার। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে কনফিডেন্স।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নে পুঁজিবাজার থেকে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে টাকা তুলতে যাচ্ছে কনফিডেন্স। বিনিয়োগকারীদের সামনে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব তুলে ধরতে গতকাল রোড শোর আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পুঁজিবাজার থেকে তোলা অর্থের ৮৩ শতাংশ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি কেনা ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে খরচ করা হবে। বাকি ১৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ও ২ শতাংশ আইপিওসংশ্লিষ্ট খাতে খরচ করবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে ৩৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে কনফিডেন্স পাওয়ারের। এর মধ্যে ৩৩৯ মেগাওয়াট উত্তরবঙ্গে। এর বাইরে চট্টগ্রামে ৫৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে তাদের।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও বিদ্যুতের চাহিদা-সরবরাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ তুলে ধরেন ইমরান করিম। এতে বলা হয়, প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
কয়েক বছর ধরে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। উৎপাদনের সক্ষমতা সাড়ে ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের অভাবে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটি মিলে আরও প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিত বন্ধ থাকে। সব মিলিয়ে এ খাতে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহার করার মতো থাকে, যা জ্বালানির অভাবে সব সময় চালানো যায় না।
ইমরান করিম বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে সরকারের মহাপরিকল্পনা আছে। গ্যাস সরবরাহ শিগগিরই বাড়বে না। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেই ভরসা করতে হবে আমাদের।
সরকারও সেদিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার। এর আগে মাত্র দুই বছরের মাথায় তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এনেছে। সাত বছর ধরে নিয়মিত সরবরাহ করছে।’ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও তারা সাফল্য পাবেন বলে আশাবাদী তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দরপত্রেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার। বর্তমানের ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতাকে বাড়িয়ে ২০২৯ সালেই ১ হাজার মেগাওয়াট করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা।
এরপর এটি আরও বাড়িয়ে ২ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়ার কথা ভাবছে কোম্পানিটি। ব্যাটারিশিল্পেও বিনিয়োগ আছে কোম্পানিটির। তারা বলছে, দেশের চলমান জ্বালানিসংকটের সমাধান হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।



