প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
“নার্সই হাসপাতালের কেন্দ্রবিন্দু, নার্সই স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড।” বাস্তবতার সঙ্গে এই বক্তব্যের মিল নেই। হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত সর্বত্র নার্সদের নিরলস উপস্থিতি থাকলেও, নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটিতে তাদের উপস্থিতি অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
কারণ নীতি নির্ধারনী মহল কোনক্রমেই নার্সদেরকে তাদের পাশাপাশি বসতে স্থান দেন না। যদিও নার্সরা এখন দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে অনেকেই প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়েছেন।
সম্প্রতি “Nursing and Health Workforce Development Study Tour” উপলক্ষ্যে একটি সরকারি প্রতিনিধিদলকে ফিলিপাইনে পাঠানোর উদ্যোগকে ঘিরে সারাদেশের নার্সিং পেশাজীবীদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নার্সিং উন্নয়ন বিষয়ক এই সফরে বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারকগন অন্তর্ভুক্ত হলেও, উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ নার্সিং পেশাজীবীদের পর্যাপ্ত উপযুক্ত প্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও তাদের কাউকেই মনোনয়নপত্র দেওয়া হয় নি! বা প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি।
বাংলাদেশে বর্তমানে শতাধিক নার্স এমএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী নার্স রয়েছেন। বহু অভিজ্ঞ নার্স শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী দক্ষ কর্মকর্তারাও আছেন। তারা দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষিত, গবেষণায় অবদান রেখেছেন এবং নার্সিং শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তাহলে নার্সিং উন্নয়নের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগে তারাই কেন উপেক্ষিত হবেন?—এই প্রশ্ন আজ স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, সরকারি নির্দেশনায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় পেশাজীবী গোষ্ঠী— এখানেও নার্সদের স্থান দেওয়া হয়নি।
অথচ হাসপাতালের সার্বক্ষণিক সেবাদান, রোগীর নিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত সেবা নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলের তালিকায় স্থান পান নি।
এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন। যে পেশাজীবীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি সমস্যা ও সম্ভাবনা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন, তাদের মতামত ছাড়া কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নার্সরা শুধু রোগীর শয্যাপাশেই সীমাবদ্ধ নন; তারা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, হাসপাতাল প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নার্সদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আধুনিক, দক্ষ ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তবে নার্সদের শুধু কর্মী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণের অংশীদার হিসেবেও মূল্যায়ন করতে হবে।
আজ সময় এসেছে কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের— নার্সিং-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও স্টাডি ট্যুরে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নার্সদের বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কমিটিতে নার্সদের প্রতিনিধিত্ব আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নার্সিং পেশাজীবীদের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দিতে হবে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নার্সদের নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু বক্তৃতায় নয়, বাস্তব সিদ্ধান্তেও যদি বলা হয় “নার্সই হাসপাতালের মেরুদণ্ড”, তবে সেই মেরুদণ্ডকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা এক ধরনের সাংগঠনিক বৈপরীত্য। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে অবদান রাখা প্রতিটি পেশার যথাযথ মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
নার্সদের বাদ দিয়ে নার্সিং উন্নয়নের পরিকল্পনা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এখন সময় এসেছে প্রতীকী স্বীকৃতি নয়, বরং বাস্তব অংশীদারিত্ব নিশ্চিত ও সংশ্লিষ্ট নার্সিং কর্মকর্তাবৃন্দের মতামত গ্রহণ করার। এটাই হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লেখক- নার্সিং শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট




