নিউজ ডেস্ক : আজ (৩০ নভেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বাদশ আসরের নিলামের পর্দা উঠছে। রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে দল গোছাতে অংশ নেবে আসরের টিকিট পাওয়া ৬ দল। তার আগে জেনে নেয়া যাক প্লেয়ার কেনার লড়াইয়ে নামতে মাথায় কোন বিষয়গুলো রাখতে হয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে।
ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন ক্রিকেটে বহুল চর্চিত ধারণা। বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায় বলে ভারসাম্য করে সাজানো হয় ব্যাটিং লাইনআপ। এই ব্যাকরণ না মেনে ২০২০ পিএসএলে মুলতান সুলতানস দল গঠন করেছিল বাঁহাতি নির্ভর। টপঅর্ডারের ৬ ব্যাটারের মধ্যে ৫ জনই ছিলেন বাঁহাতি।
মুলতান সুলতানসের যুক্তি মন্দ ছিল না। পিএসএলে ডানহাতি অফস্পিনারের সংখ্যা খুবই কম। বাঁহাতি ব্যাটার কম বলেই হয়তো এই চিত্র। আবার বাঁহাতি ব্যাটার মানেই ডানহাতিদের তুলনায় সফল। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে ডানহাতিদের তুলনায় বাঁহাতিদের স্ট্রাইকরেট বেশি, গড় বেশি। মুলতানের দল সাজানোর পরিকল্পনা ‘হিটিং অ্যাগেইনস্ট দ্য স্পিন’ বইয়ের দ্য সুলতান অব স্পিন অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করেছেন দলটির তৎকালীন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট বেন জোনস।
মুলতানের ব্যাটিং লাইনআপ হয়েছিল এমন—শান মাসুদ, জেমস ভিন্স, মঈন আলী, রাইলি রুশো, জিশান আশরাফ, খুশদিল শাহ, শহীদ আফ্রিদি…। জোনস লিখেছেন, এই দল দেখে প্রায় সব বিশ্লেষক মুলতানকে গ্রুপপর্ব থেকে বাদ ধরেছিলেন। মুলতান অবশ্য বাদ যায়নি, প্লেঅফে উঠেছিল শীর্ষে থেকে। যদিও শিরোপা জেতা হয়নি।
বিপিএলেও চিত্রটা একই। প্রতিযোগিতাটিতে এখন পর্যন্ত মোট ১৬০ জন বাঁহাতি ব্যাটার খেলেছেন। ৩৬৭ জন ডানহাতির তুলনায় তাদের স্ট্রাইকরেট বেশি ১.২২, গড় বেশি ১.২৭। পার্থক্যটা আরও বেড়েছে গত আসরে। ২০২৪-২৫ বিপিএলে ডানহাতিরা ব্যাট করেছেন ১২৯.৮১ স্ট্রাইকরেটে, বাঁহাতিরা ১৩৭.০০ স্ট্রাইকরেটে। আর গড়? ডানহাতিদের ২২.৩৫, বাঁহাতিদের ২৫.৬০।
ডানহাতি অফস্পিনারের সংখ্যাও বাঁহাতি নির্ভর দল গঠন করার সাজেশন দেয়। গত আসরে ৬৪ জন স্পিনার বল করেছেন ৭০৩.৫ ওভার। এরমধ্যে ২১ জন ডানহাতি অফস্পিনার করেছেন ৩৪২.২ ওভার, পার্টটাইমার (অন্তত ২০ ওভার করেননি) বাদ দিলে ডানহাতি স্পিনারের সংখ্যা নেমে আসে ৭-এ, গড়ে প্রতি দলে প্রায় ১ জন করে।
ব্যাটিং ও বোলিংয়ে ভারসাম্য
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর কাহিনী সবার জানা। এই দলটির হয়ে খেলেছেন ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্স, বিরাট কোহলি, শেন ওয়াটসন ও ডু প্লেসির মতো ক্রিকেটাররা। তারকা ব্যাটারে ভরতি, কিন্তু প্রায় প্রতিবার বোলিং বিভাগ দুর্বল। বেঙ্গালুরুরও কখনও শিরোপা জেতা হয়নি। এই ভারসাম্যহীনতা নিয়ে ২০১৯ সালে ক্রিকেট ২.০ বইয়ে বিশদ লিখেছিলেন ফ্রেডি উইল্ড। বেঙ্গালুরু স্থানীয় ক্রিকেটারদের গুরুত্ব দেয় না, এই মতও তার। দলটি ২০২৫ সালে আইপিএল জিতেছে, ফ্রেডি ছিলেন দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট।
বিদেশি ব্যাটার ও স্থানীয় অ্যাঙ্কর
অন্য অনেক লিগের মতো একাদশে ৪ জন বিদেশির অনুমোদন আছে বিপিএল কর্তৃপক্ষের। এটা দলগুলোকে স্থানীয় ও বিদেশি প্লেয়ার বুঝেশুনে কিনতে বাধ্য করে। আপনি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হলে কোন ধরনের বিদেশি কিনবেন? স্থানীয়রাই বা হবে কেমন? এই জন্য নজর দিতে হয় কয়েকটি বিষয়ের ওপর। স্থানীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি কোন জায়গায়? ব্যাটার, আরও নির্দিষ্ট করে বললে হার্ডহিটার ব্যাটার বা ফিনিশার। বিদেশিদের কোটার অধিকাংশই তাই ব্যাটার দিয়ে পূরণ করা হতে পারে বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশের আরেকটি ঘাটতির জায়গা পেস বোলিং অলরাউন্ডার। এই ক্ষেত্রেও বিদেশিদের দিকে ঝোঁকা যেতে পারে।
কেন উইলিয়ামসন আইপিএলের দুই আসরে ১৪০-এর বেশি স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করেছেন। তবে টি-টোয়েন্টিতে ৭০০০+ রান করার পথে ১২৩.৪৫ স্ট্রাইকরেট তাকে অ্যাঙ্কর হিসেবেই পরিচয় করায়। ক্রিকেট মান্থলিকে গত জুনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কোনো কোনো মাঠে ১৪০-ও হতে পারে জয়ের মতো স্কোর। উইলিয়ামসন বাংলাদেশ বা মিরপুরের কথা উল্লেখ করেননি। আধুনিক ক্রিকেটে অ্যাঙ্করদের প্রয়োজনীয়তা কম হলেও বিপিএলের ভেন্যুগুলো, বিশেষ করে মিরপুর এখনও ২–৩ জন কিংবা তার চেয়েও বেশি অ্যাঙ্কর ব্যাটারের দাবি রাখে। এই মিরপুরেই হবে প্লেঅফের ম্যাচগুলো। স্থানীয়দের গুরুত্ব দিয়ে অ্যাঙ্করদের নেয়া উচিত বাংলাদেশ থেকে।
দেশি ফিঙ্গার স্পিনার
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, ক্রিকেটীয় কনটেক্সটে বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনারের। মোহাম্মদ রফিক উল্লেখ করার মতো দেশের প্রথম বাঁহাতি স্পিনার। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে প্রথম একশ উইকেট তার, তিন ফরম্যাটে প্রথম দুইশও। সাকিব আল হাসান তো কিংবদন্তিই, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে সাতশর বেশি উইকেট তার। আবদুর রাজ্জাক খেলেছেন লম্বা সময়। তাইজুল ইসলাম টেস্টে দেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। বলা যায় তার উত্তরসূরিরও দেখা মিলেছে—আয়ারল্যান্ড টেস্ট দিয়ে অভিষেক হয়েছে হাসান মুরাদের। নাসুম আহমেদ আছেন, তানভীর ইসলামের সাদা বলের ক্রিকেটে এরইমধ্যে অভিষেক হয়ে গেছে। অনেকে জাতীয় দলে কড়া নাড়ছেন।
বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনারদের প্রাচুর্যতা ও একাদশে বিদেশি ক্রিকেটারের কোটা আমলে নিয়ে বলা যায়, বিদেশি ফিঙ্গার স্পিনার কেনা বিপিএলের দলগুলোর জন্য একপ্রকার অপব্যায়। যদি না সেই স্পিনারের মধ্যে বিশেষ কিছু থাকে। তবে বিদেশি লেগ স্পিনার কেনা যেতে পারে, সংখ্যাটা একাধিক হলে বরং আরও ভালো। রান বিলালেও মিডলওভারে তারা উইকেট এনে দিতে পারেন।
পাওয়ার প্লে ও ডেথওভার বোলার
সাদা বলে প্রতিটি ধাপের জন্য স্পেশালিস্ট প্লেয়ারদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিলিপ সল্ট ভালো টি-টোয়েন্টি প্লেয়ার, কিন্তু পাওয়ারপ্লেতে দুনিয়ার সেরা। তার প্রায় ৮ হাজার টি-টোয়েন্টি রানের অর্ধেকের বেশি এসেছে প্রথম ৬ ওভার থেকে। মারুফা আক্তার পাওয়ারপ্লেতে খুবই ভালো বোলার, পরের ধাপগুলোতে ততটা নয়। নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার ৬ উইকেটের মধ্যে ৫টিই পাওয়ারপ্লেতে।
অনেকে বিশ্বাস করেন, পাওয়ারপ্লেতে উইকেট নিতে পারা মানে প্রতিপক্ষের রান ১৫–২০ কমিয়ে দেওয়া। সে জন্য খরুচেদের ক্ষেত্রেও পাওয়ারপ্লেতে স্ট্রাইকরেট ভালো হলে সেই বোলারকে গুরুত্ব দেওয়া যায়। ডেথ ওভারে উলটো হিসাব। এই ধাপে উইকেট নেয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ রান আটকে রাখা। কেউ দুটিই ভালো পারলে তো সোনায় সোহাগা!
নিলাম টেবিলে মাথায় রাখতে হয় আরও কিছু জিনিস
নিলাম টেবিলে কেবল নিজেদের দল গোছানোর পরিকল্পনা মাথায় রাখলেই হয় না, ব্যাঘাত ঘটাতে হয় অন্যদেরও। প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি পেয়েছে ৯ কোটি টাকার বাজেট। এই সীমাবদ্ধতার কারণে অন্যদের বেশি দাম দিয়ে প্লেয়ার কেনার দিকে ঠেলে দিতে হয়, যাতে সহজেই নিজেদের টার্গেট করা প্লেয়ার কেনা যায়।



