মোঃ জহিরুল ইসলাম
রাজধানীর হাজারীবাগে পুরনো ট্যানারি এলাকার তিন মাজার গলির ‘বাসার লেদার’ ভবনের নিচতলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শনিবার দিবাগত রাতে সাড়ে ১টার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া দুই কোটি ১০ লাখ টাকা। পুড়ে গেছে খেলনার গোডাউন, চামড়া ও প্লাস্টিকের মজুদপণ্য, ইভেন্ট সামগ্রী, ধাতব যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যালসহ অন্তত ছয়টি ক্ষুদ্র কারখানা ও গোডাউনের মালামাল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুনের সূত্রপাত হয় ‘বাসার লেদার’ ভবনের নিচতলায় অবস্থিত খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘টয় কিং’-এর গোডাউন থেকে। প্রতিষ্ঠানটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করতেন মুনিব ওয়াকার। সেখানে বিপুল পরিমাণ চীনা যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক, ধাতব সামগ্রী ও দাহ্য কেমিক্যাল মজুদ ছিল। আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পাশের ফেনী ট্যানারি, ইউসুফ ট্যানারিসহ অন্যান্য ভবনে।
মুবিন ওয়াকার-এর সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ফেনী ট্যানারিতে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী মো. আনিস মোল্লা বলেন, “রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ দেখি ভেতরে আগুনের ঝলকানি। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। আমরা চিৎকার করে পাশের ভবনের লোকজনকে জাগিয়ে তুলি।”
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রাত ২টা ৫৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে সম্পূর্ণভাবে নির্বাপিত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন হাজারীবাগ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার সুভাষ বারুই।
এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ফেনী ট্যানারিতে গোডাউন ভাড়া নেওয়া জুতার সোল প্রস্তুতকারক মো. সেলিম। তিনি বলেন, “আমার তিন-চারটা মেশিন ছিল, যেগুলো দিয়ে জুতার সোল তৈরি করতাম। আগুনে সব যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
পাশেই ছিলেন মো. মামুন হোসেন, একজন চামড়া ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “আমি এক বছর ধরে ফেনী লেদারে ‘স্পিড লেদার’ নামে ব্যবসা করছি। ঈদের আগে ৫০ হাজার স্কয়ার ফিট চামড়া কিনেছিলাম। সবই আগুনে পুড়ে গেছে। আমার ৩০–৪০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।”
ফেনী লেদারে আরেক চামড়া ব্যবসায়ী মো. রমজান বলেন, “আমি সাত-আট বছর ধরে এখানে গোডাউন ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছি। আমার ৩০ হাজার স্কয়ার ফিট চামড়া পুড়ে গেছে, যার মূল্য ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা।”
চামড়া ব্যবসায়ী মো. মামুন হোসেন আরও জানান, আগুনের সূত্রপাত যেখান থেকে— সেই টয় কিং লেদার গোডাউনে তার ধারণামতো ৬০–৭০ লাখ টাকার মালামাল মজুদ ছিল। সেখানে ধাতব জাতীয় কেমিক্যাল, রাবার এবং বিভিন্ন চায়না ও বিদেশি প্লাস্টিক সামগ্রী ছিল, যেগুলো মূলত খেলনা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হতো।
তিনি বলেন, “টয় কিং লেদারে যেভাবে দাহ্য পদার্থ রাখা হয়েছিল, তাতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু আমার না, অন্য ব্যবসায়ীদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছি।”
হাবিব নামে আরেক ব্যবসায়ী জানান, “আমার স্পিড লেদারের গোডাউনে প্রায় ৮–৯ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।” তিনি গরুর গর্দানের চামড়া প্রস্তুত করে স্পিড চামড়া হিসাবে বাজারজাত করতেন।
পাশের একজন ইভেন্ট সামগ্রী ব্যবসায়ী রুজবেল, গোডাউন ভাড়া নিয়ে বিয়ের মঞ্চ, স্টেজের ভাস্কর্যসহ নানা সামগ্রী তৈরি করতেন। তার এক বন্ধু জানান, “রুজবেলের অন্তত ৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে।”
ইউসুফ ট্যানারির পশ্চিম পাশে পাঁচ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করছেন মো. ইউসুফ। তিনি বলেন, “আমার গোডাউনে ১০ লাখ টাকার মতো স্পিড চামড়া ছিল। এর মধ্যে দুই–আড়াই লাখ টাকার চামড়া পুড়ে গেছে।”
মো. সেলিম অভিযোগ করেন, “টয় কিং-এর মালিকের কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। বহুবার তাকে সচেতন হতে বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তার অবহেলায় আমাদের সবার এই বিশাল ক্ষতি হয়েছে।”
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই হাজারীবাগের একাধিক ট্যানারি ভবনে মজুদ বিপজ্জনক কেমিক্যাল গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইউসুফ লেদারের পাশে একটি গোডাউনে থাকা কেমিক্যাল আগুনের পরদিন সকালে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এছাড়া ‘রাজ ট্রেডার্স’ নামে একটি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ফেনী ট্যানারির বাউন্ডারির ভেতরে। এ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসী মাহফুজ বলেন, “ওই গোডাউনে সারি সারি সিলিন্ডার ছিল। একটুর জন্য বেঁচে গেছি। সেখানে আগুন ধরলে পুরো এলাকা উড়ে যেত। সকালে সব মাল গাড়িতে করে সরিয়ে ফেলা হয়।”
‘রাজ ট্রেডার্স’-এর কর্মচারী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “এলাকায় প্রায় সব ট্যানারি ভবনের ভেতরে চামড়ার, প্লাস্টিকের, টেক্সটাইলের কেমিক্যাল রাখা হয়। এসব দাহ্য পদার্থ কোনো তদারকি ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা হয়। অধিকাংশ ভবনেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই।”
বর্তমানে রাজধানীর হাজারীবাগের পুরনো ট্যানারি ভবনগুলোতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে চামড়া ও জুতা তৈরির কারখানা, প্লাস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারী কারখানা এবং ধাতব দ্রব্যের ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্র। সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। এলাকাটিতে অন্তত শতাধিক ভবনে চলছে এ ধরনের অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে হাজারীবাগ এখন যেন বিস্ফোরক সম্ভারে ভরা জনপদে পরিণত হয়েছে। এসব ভবনে দাহ্য পদার্থ মজুদ থাকায় প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে বসবাস করছেন সাধারণ মানুষ।



