বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছেন। এতে তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১ আগস্ট থেকে যদি বর্ধিত শুল্ক কার্যকর হয়, তাহলে ক্রয়াদেশ অনেক কমে যেতে পারে। কারণ, শুল্কের বাড়তি খরচ বহন করতে পারবেন না উৎপাদনকারীরা। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর প্রযোজ্য শুল্কহারের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি করছে। চূড়ান্ত ফলের ওপর নির্ভর করবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের কিছু মতামত নিয়েছে সরকার। পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু গতকাল বলেন, সরকার আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের ওপর উৎস বিধির শর্ত যদি ৪০ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে সক্ষমতা প্রশ্নে আমাদের সমস্যা হবে কিনা? আমরা বলেছি, ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আমাদের সক্ষমতার মধ্যেই থাকবে। অর্থাৎ, তৈরি পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত এ পরিমাণ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে জোগান দিতে হবে।
একক বাজার হিসেবে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের অন্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানিতেও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। বিজিএমইএ এবং বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ওয়ালমার্ট, স্মার্টেক্সসহ কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের বড় একটি অংশ যায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্যাট্রিয়ট ইকো অ্যাপারেল লিমিটেডকে ১০ লাখ সাঁতারের প্যান্টের ক্রয়াদেশ দিয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ডলার। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি ওই ক্রয়াদেশ স্থগিত করে। ওয়ালমার্টকে এসব পণ্য সরবরাহ করার কথা ছিল ক্ল্যাসিক ফ্যাশনের। তারাই প্যাট্রিয়ট ইকো অ্যাপারেলকে ই-মেইলে ক্রয়াদেশ স্থগিতের কথা জানায়।
এ ব্যাপারে প্যাট্রিয়ট ইকো অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, তারা ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছেন, বাতিল করেননি। তার পরও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, এত বেশি শুল্ক দিয়ে পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে না।
এটিএস অ্যাপারেল লিমিটেড যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম বলেন, বর্ধিত শুল্ক আরোপ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পোশাক খাত। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর বিষয়ে কী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা দেখতে হবে।
শুধু ওয়ালমার্টে পণ্য সরবরাহ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, ওয়ালমার্ট থেকে তাদের কোনো ক্রয়াদেশ এখন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়নি।
নিট শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সূত্রে জানা গেছে, মাদার কালার লিমিটেডের ৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান স্মার্টেক্স। তারা গত বৃহস্পতিবার ই-মেইল করে তাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত করে। এ ছাড়া চট্টগ্রামভিত্তিক ফোর এইচ নামে একটি কারখানায়ও যুক্তরাষ্ট্রের বায়াররা কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছেন। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এর আগে প্যাসিফিক সোয়েটার্স কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ সমকালকে জানান, মার্কিন একটি বড় ব্র্যান্ডের রপ্তানি আদেশের ৬০ হাজার পিস টি-শার্টের কাজ চলছিল তাঁর কারখানায়। নতুন শুল্কের ঘোষণা আসার পর ব্র্যান্ডটি কাজ বন্ধ রাখতে ই-মেইল করেছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭০ কোটি ডলার। মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশই পোশাক। মোট পোশাক রপ্তানির ২০ থেকে ২২ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট চাচ্ছে : ফাওজুল কবির খান
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথমে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট চাচ্ছে। এ ব্যাপারে কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। এর পর ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ নিয়ে আলোচনা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বন্দর ও রাজস্ব আদায় আরও গতিশীল করতে গঠিত কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল রোববার উপদেষ্টা এ কথা বলেন।



