প্রফেসর মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ, প্রতিবাদ, হামলা, ভাঙচুর ও গণপিটুনির ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
অভিযোগ
কোথাও রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ, কোথাও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, আবার কোথাও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ। অন্যদিকে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
সংকট
কেবল স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়; এটি জনআস্থার সংকট, ব্যবস্থাপনার সংকট এবং জবাবদিহি সংকট এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
সমস্যার কারণ
অতিরিক্ত রোগীর চাপ: অনেক সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী আসে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে এত রোগীকে মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জনবলের ঘাটতি: অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে অপেক্ষার সময় বাড়ে, রোগীর অসন্তোষও বাড়ে।
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: সময়মতো রোগী দেখা, জরুরি সেবা, বেড ব্যবস্থাপনা, রেফারেল ব্যবস্থা, ওষুধ সরবরাহ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান।
যোগাযোগের ঘাটতি: অনেক সময় রোগীর স্বজনদের রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার ঝুঁকি বা সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে জানানো হয় না। ভুল বোঝাবুঝি থেকে ক্ষোভ তৈরি হয়।
বেসরকারি খাতে নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা: সব বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক একই মান বজায় রাখে না। কোথাও দক্ষ জনবলের অভাব, কোথাও পর্যাপ্ত তদারকির অভাব নিয়ে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা: রোগীর পরিবার অনেক সময় মনে করে, অভিযোগ করেও বিচার মিলবে না। ফলে কেউ কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব: অনেক ঘটনার ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে, আবার কিছু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমনে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
পেশাজীবীদের উদ্বেগ: সব পেশাজীবী নীরব—এমনটি বলা সঠিক হবে না। অনেক চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল প্রশাসক বিভিন্নভাবে সমস্যার সমাধানে কাজ করছেন। তবে জনসাধারণের কাছে তা দৃশ্যমান নাও হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—
-প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা
-সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সীমা
-আইনি জটিলতা
-সমালোচনার ভয়
-পেশাগত সংগঠনগুলোর তুলনামূলক দুর্বল ভূমিকা
-গণমাধ্যমে ইতিবাচক উদ্যোগ কম প্রচার পাওয়া
হাসপাতাল ভায়োলেন্স
হাসপাতালে সহিংসতার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে—
-চিকিৎসা নিয়ে হতাশা
-দীর্ঘ অপেক্ষা
-মৃত্যুর পর আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া
-গুজব ও উত্তেজনা
-আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা
-নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা
নিরপেক্ষ তদন্ত
কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে চিকিৎসায় অবহেলা বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত।




