ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশ‘আঁরা রোহিঙ্গা, বার্মা সরকারে বাঙালি হদ্দে’ রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর

‘আঁরা রোহিঙ্গা, বার্মা সরকারে বাঙালি হদ্দে’ রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর

মোহাম্মদ ইউনুছ অভি টেকনাফ  : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টুডেং জব্বারপাড়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের বয়স এখন ৮৬ বছর। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি শিক্ষকতা করেছেন। নিজ এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুকে পড়িয়েছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা—নিজ জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা।

আব্দুল জব্বারের এই আকাঙ্ক্ষা যেন লাখো রোহিঙ্গার হারানো অধিকার, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি। তাঁর ভাষায়, ‘যেখানে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার পূর্বপুরুষেরা বসবাস করেছে, সেখানে আমাকে কেন বাঙালি বলা হবে? আমি রোহিঙ্গা। এখন জীবনের শেষ সময়ে আমার একটাই ইচ্ছা—নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।’

মিয়ানমার সরকারের প্রচলিত বক্তব্য ছিল, ‘মিনডু রোহিঙ্গাই মহবু, মিনডু বিঙালি বে’—অর্থাৎ, ‘তোমরা রোহিঙ্গা নও, তোমরা বাঙালি।’ রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, এই পরিচয় অস্বীকারের মধ্য দিয়েই তাঁদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

নাগরিকত্ব থেকে রাষ্ট্রহীনতা

আব্দুল জব্বার জানান, ১৯৫৬ সালে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তখন তাঁরা তালিকাভুক্ত নাগরিক ছিলেন। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য জনগোষ্ঠীর মতোই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন।

তবে কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই অধিকার সংকুচিত হতে থাকে। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক সরকারের ‘ড্রাগন কিং’ অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ব্যাপক ধরপাকড় ও নির্যাতন শুরু হয়। ‘বিদেশি বিতাড়ন’ কর্মসূচির নামে উত্তর রাখাইনে সেনা অভিযান চালানো হলে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয়ে কয়েক মাসের মধ্যে দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

আব্দুল জব্বারও তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে অনেক রোহিঙ্গা নিজ এলাকায় ফিরে যান। তাঁদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, রাখাইনে ফিরলে আগের অধিকার ফিরে পাবেন। কিন্তু তাঁর দাবি, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, ‘১৯৭৮ সালের অভিযানের সময় গ্রেপ্তারের ভয়ে আমরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। পরে চুক্তি হলে আবার ফিরে যাই। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী অধিকার দেওয়া হয়নি। উল্টো কয়েক বছর পর সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়।’

১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন আনা হলে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠী কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে।

আব্দুল জব্বারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে পরিচয়পত্র পরিবর্তনের নামে পুরোনো পরিচয়পত্র জমা নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের নাগরিক পরিচয় দুর্বল করা হয়।

২০০৪ সালে শেষবারের মতো বাংলাদেশে চলে আসেন আব্দুল জব্বার। এরপর থেকে তাঁর জন্মভূমিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়েছে।

‘আমরা রোহিঙ্গা, আমাদের বাঙালি বলা হয়’

রোহিঙ্গা এআরএসপিএইচের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের বাঙালি বলে বিতাড়িত করা হয়েছিল। রোহিঙ্গা ভাষায় বলা হয়, “আঁরা অইল্যাম দে রোহিঙ্গা, আঁরারে বার্মা সরকারে বাঙালি হদ্দে”—অর্থাৎ আমরা হচ্ছি রোহিঙ্গা, বার্মা সরকার আমাদের বাঙালি বলে।’

তাঁর অভিযোগ, পরিচয়ের এই সংকটের কারণেই রোহিঙ্গাদের নাগরিক ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

জুবায়ের বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে আলোচনা হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। রাখাইনে এখনো অস্থিরতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরার পরিবেশ নেই।

২০১৭ সালের ঢল

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ২০১৬ সালেও অনেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের অনেকেই নিজ জন্মভূমি রাখাইনে ফিরতে চান। তবে তাঁদের প্রধান দাবি নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, বসতভিটা ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার।

দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে তা সফল হয়নি।

এরপর ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট চীনের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি হননি।

রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনের আগে পাঁচটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো—মিয়ানমারের পূর্ণ নাগরিকত্ব, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, বসতভিটা ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক বিচারের আওতায় আনা।

তবে এসব বিষয়ে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

রাখাইনের সংঘাত নতুন বাধা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত বেড়েছে। রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছে।

রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, আগেও দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতি আরও জটিল।

তাঁর মতে, শুধু মিয়ানমার সরকার রাজি হলেই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়; রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

তালিকা যাচাইয়ে ধীরগতি

বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৯ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে মিয়ানমার প্রায় ৪২ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে দেশটি।

তবে তথ্যগত ত্রুটি ও নানা জটিলতার কারণে যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, বর্তমানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। জন্মহার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও চাপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর ব্যবস্থাপনা ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

‘জীবনের শেষ সময়ে দেশে ফিরতে চাই’

৮৬ বছর বয়সী আব্দুল জব্বার এখনো অপেক্ষায় আছেন। যে মাটিতে তাঁর জন্ম, যে এলাকায় জীবনের বড় সময় শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন, সেই মাটিতে ফিরে যেতে চান তিনি।

তাঁর কথায়, ‘১৯৫৬ সালে আমরা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পেয়েছিলাম। তখন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতাম। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় অনেক মানুষ আমাদের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে তারা ফিরে যায়। কিন্তু এরপর থেকেই আমাদের ওপর সমস্যা শুরু হয়। মিয়ানমার সরকার মনে করল, সেখানে বাঙালি রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি রোহিঙ্গা। আমার জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চাই। জীবনের শেষ সময়ে নিজের দেশের মাটিতে থাকতে চাই।’

তবে তাঁর সেই অপেক্ষা কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular