সুমন দত্ত: বিদ্যুৎ চালিত রিকন্ডিশন( বিদেশে ব্যবহার করা) প্রাইভেট কার (EV) আমদানি নিষিদ্ধ না করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিক্যালস ইম্পোটার্স এন্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন সংক্ষেপে বারভিডা। তারা বিদেশি রিকন্ডিশন বিদ্যুৎ চালিত জাপানি গাড়ি আমদানি করতে চান। গত ২৪ আগস্ট সরকারের ঘোষিত বিদ্যুৎ চালিত রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানির নিষিদ্ধের আদেশ বাতিল চান তারা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং) ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি আবদুল হক এ দাবি জানিয়েছেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বারভিডার শীর্ষ নেতারা। সভাপতি বলেন, আমরা কারো বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলছি না। আমরা দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে এসব প্রস্তাব ও দাবি রাখছি। গাড়ি দাম কম রাখতে আমরা এসব প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের প্রস্তাব রাখা হলে অনেকেই কম দামে গাড়ি কিনতে পারবে। নতুন গাড়ি সবার পক্ষে কেনা সম্ভব না। কারণ এর উচ্চমূল্য।
তিনি বলেন, EV শুধু একটি গাড়ি নয়-একটি নতুন শিল্প-অর্থনীতির সূচনা। EV আমদানি নিষিদ্ধ না করে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং নির্দিষ্ট বয়স ও কারিগরি সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত ও শর্তসাপেক্ষ ব্যবহৃত/রিকন্ডিশন্ড EV আমদানির সুযোগ পুনর্বহাল করা । সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি নীতি প্রণয়নে সবার আগে বিবেচনা করা জরুরী, কারন : ক. নতুন ইভি’র মূল্য এখনো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে। রিকন্ডিশন্ড ইভি তুলনামূলক কম দামে, অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনকারী পেশাজীবী ও সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন পরিবহন ব্যয় কমবে। ইভি’র বাজার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোটরযান খাতে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তরল জ্বালানি আমদানি করতে হয়। প্রাগ ইন হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। সুতরাং ইভি শুধু একটি পরিবহন প্রযুক্তি নয়, এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
চার্জিং অবকাঠামো দ্রুত গড়ে তুলতে ইভি’র বিস্তৃত বাজার প্রয়োজন
ক. চার্জিং স্টেশন স্থাপন তখনই অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হবে, যখন দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইভি চলাচল করবে। ইভি সার্ভিসিং ও দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ। EV প্রযুক্তি প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের গাড়ির চেয়ে ভিন্ন। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চ- ভোল্টেজ সেফটি প্রশিক্ষণ, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক, মোটর ও কন্ট্রোলার সার্ভিসিং, সফটওয়্যার ডায়াগনস্টিক, চার্জার মেরামত, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জ্ঞান এবং ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও পুনর্ববিহারের ক্ষেত্র তৈরী হবে।
রিকন্ডিশন্ড ইভি এর একটি বিজ্ঞানসম্মত নিয়ন্ত্রিত বাজার থাকলে দেশের তরুণদের জন্য নতুন ধরনের কারিগরি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।
দেশীয় EV শিল্প গড়ে ওঠার পথও প্রশস্ত হবে
তিনি বলেন, আমরা মনে করি, আমদানি, ব্যবহার, সার্ভিসিং, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা, অ্যাসেম্বলি ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই একটি দেশ ধীরে ধীরে নিজস্ব অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তুলতে পারে। একটি শক্তিশালী বাজারভিত্তির উপর নির্ভর করেই এই শিল্প খাত তৈরি হতে পারে।
খ. রিকন্ডিশন্ড EV কে দেশীয় EV শিল্পের প্রতিদন্ধী হিসেবে নয়, বরং শিল্প বিকাশের প্রাথমিক সেতু হিসেবে দেখা উচিত।
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। ইলেকট্রিক বাস ট্রাক আমদানিতে যথার্থ প্রণোদনা এবং ফলাফল
০৭ এপ্রিল ২০২৬ NBR শিক্ষার্থী, সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ইলেক্ট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক-কর তুলে দেয়।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত সরকারের যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্তের আলোকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি উদ্যোক্তারা কোন ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক আমদানি করেছে – মর্মে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।কিন্তু কেন আমদানি শূন্যতা ? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এ বিষয়ে কোন পর্যালোচনা আছে কিনা, আমাদের জানা নেই।
আমাদের প্রস্তাবনা । নিয়ন্ত্রিত আমদানি কাঠামোর প্রেক্ষিত
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশকে নন মোটরাইজড সোসাইটি থেকে মোটরাইজড সোসাইটিতে উত্তরণে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আমাদের উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের যে ক্লান্তিহীন পথচলা, সে সব পেশাজীবিদের জাতীয় বাণিজ্য সংগঠন বারভিডার পক্ষ থেকে আমরা নিমোক্ত কাঠামো বিবেচনার প্রস্তাব করছি :
প্রস্তাব – ১
প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত/রিকন্ডিশন্ড EV আমদানির অনুমতি দেওয়া ।
প্রস্তাব-২
ব্যাটারির ন্যূনতম State of Health (SOH) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা।
ক্রেতা স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত ও উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত নতুন ইলেকট্রিক ভেহিকেল এর ব্যাটারির আয়ুস্কাল সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা।
প্রস্তাব-৩
আমদানির আগে অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে কার্যকর পরিদর্শন এবং প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা।
প্রস্তাব – ৪
বন্যা, অগ্নিকান্ড, গুরুতর দুর্ঘটনা বা কাঠামোগত ক্ষতিগ্রস্ত EV আমদানি নিষিদ্ধ করা।
প্রস্তাব -৫
EV ব্যাটারির জন্য Battery Recycling / Safe Disposal Framework প্রণয়ন করা।
প্রস্তাব -৬
চার্জিং স্টেশন, সার্ভিসিং, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক ও রিসাইক্লিং খাতের প্রকৃত বিনিয়োগকে উৎসাহি রতে শুল্ক করে প্রদত্ত প্রণোদনা অব্যাহত রাখা।
প্রস্তাব – ৭
চলতি বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য মূল্যস্তর ভিত্তিক যে শুষ্ক/কর কাঠামো প্রনয়ন করা হয়েে ২শ্লিষ্ট খাত সমূহের সাথে আলোচনার করে যৌক্তিক বিন্যাস ও শুল্ক কাঠামোর স্তর পুন:নির্ধারণ করা।
প্রস্তাব -৮
নির্দিষ্ট সময় পর নীতির ফলাফল মূল্যায়ন করে বয়সসীমা ও অন্যান্য শর্ত পুনর্বিবেচনা করা।
বারবিভার পক্ষে তিনি সরকারের কাছে আবেদন করেন, বাংলাদেশ এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন আমাদের একই সঙ্গে, পরিবেশ রক্ষা করতে হবে,জ্বালানি সাশ্রয় করতে হবে,দেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে হবে,ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে,বিনিয়াগ বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে,চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং ভবিষ্যতের EV শিল্পের ভিত্তি তৈরি করতে হবে,এই সব লক্ষ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই EV’র নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন ।
আমরা সরকারের নীতির বিরোধিতা করছি না। এই শিল্পের জন্য আমাদের চাওয়া খুবই বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী সংস্করণ।
আমরা বিশ্বাস করি, একটি নিষেধাজ্ঞা বাজারকে থামিয়ে দিতে পারে,কিন্তু একটি সঠিক নীতি একটি শিল্পকে গড়ে তুলতে পারে। সদাশয় সরকারের কাছে বিনীত আরজ, আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০১৯ এর সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে “শর্তসাপেক্ষে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিযোগ্য” মর্মে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে একটি সুষম নীতিমালা জারি করবেন।বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই আমরা ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল আমদানির অনুমতি পুনর্বহালের জন্য আপনাদের মাধ্যমে সরকারের নিকট নিবেদন পেশ করছি।




