সুমন দত্ত
ব্রিকস সম্মেলন থেকে এবার একক মুদ্রার ঘোষণা আসার কথা ছিল। সেটি আসেনি। তবে যেটি এসেছে তা কোনো অংশে কম নয়। নিজ দেশের মুদ্রায় প্রতিটি সদস্য দেশ পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা করবে। সীমাহীনভাবে এই ব্যবসা চলবে। তাতে সমন্বয় করবে ব্রিকসের নিউ ডেভেলাপম্যান্ট ব্যাংক। দিল্লি ঘোষণাপত্রে এটি ডি-ডলারাইজেশনের অন্যতম প্রক্রিয়া। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান , সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব ব্রিকসের সদস্য।
ব্রিকস মুদ্রার বিষয়টি আলোচনার টেবিলে রয়েছে। যেকোনো সময় এটি কার্যকর হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে ভারতের আপত্তির কারণে এটি করা যাচ্ছে না। ভারত কেন এখানে আপত্তি জানাচ্ছে তার ব্যাখ্যাও অনেকের কাছে আছে। এই মুহূর্তে ফরেন রিজার্ভে চীন সবচেয়ে বেশি। ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও চীনের সঙ্গে তাদের ব্যবধান অনেক।
ব্রিকস মুদ্রা চালু হলে চীনের কাছে সবচেয়ে বেশি ব্রিকস মুদ্রা থাকবে। এতে বাকী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করবে চীন। ব্রিকস এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে চীন। এজন্য ভারত এই মুহূর্তে ব্রিকস মুদ্রা চাইছে না। তবে সদস্য দেশ গুলো তেমন মনে করছে না। তারা ব্রিকস মুদ্রার পক্ষে।
ডলারকে বাদ দিয়ে তারা বিজনেস করতে চাইছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ থেকে বের হতে চাচ্ছে। ব্রিকস তাদের সেই সুযোগ করে দিতে চাইছে। ডলারে সাহায্য দেওয়া এসব ব্যাংক মার্কিন অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। সেই জায়গা দখলে নিতে চাইছে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপম্যান্ট ব্যাংক।
রাশিয়া ব্রিকস মুদ্রার বিষয়ে ইতিবাচক। রাশিয়া চীনের মুদ্রা ইউয়ান কে ব্রিকস মুদ্রার বিকল্প হিসেবে বিজনেস করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভারত তাদের নিজদের মুদ্রা রুপিকে প্রমোট করতে চায়। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারত রুপিতে বিজনেস করার চুক্তি করেছে। ভারত ভিসা কার্ডের মতো নিজেদের রুপাই কার্ড চালু করেছে। রুপাই কার্ডকে অনেকগুলো দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি ক্যাশলেস সিস্টেম হিসেবে ইউপিআই চালু করেছে ভারত। ভারতের অভ্যন্তরে এই সিস্টেম জনপ্রিয় হচ্ছে।
ভারত জানে স্বাধীনভাবে চলতে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগে বাধা আসবে। সেই বাধা কিভাবে মোকাবিলা করা হবে তারই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ভারত এই কাজ করে যাচ্ছে। কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের ওপর আরোপ করা হলে সেই দেশটি ডলার দিয়ে ব্যবসা করতে পারে না। সুইফট সিস্টেমের বাইরে চলে যায় দেশটি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা সাজা দেওয়ার নামে রাশিয়ার সোনা জব্দ করে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন ব্যাংকে রাশিয়ার সোনা মজুদ ছিল। এসব দেখে ভারত ও চীন উভয় দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের মজুদ করা সোনা নিজ দেশের ব্যাংকগুলোতে নিয়ে এসেছে।
ব্রিকস হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক জোট। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন মদদ পুষ্ট ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ কে পাশ কাটিয়ে কিভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায় তার বিকল্পই হচ্ছে ব্রিকস। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১১ হলেও আগামীতে এই জোট অনেক বড় হবে। আর এসবই ভাবাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কে। সারা বিশ্বে মার্কিন দাদা গিরি শেষ করতে ব্রিকস গঠন হয়েছে।
এবারের সম্মেলনে চীন ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলেছে। গালওয়ান সংঘর্ষের ৭ বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট ভারত সফর করলেন। ভারত চীনকে আসস্ত করেছে তারা তাইওয়ান আক্রমণে দেশটির পাশে থাকবে না। আর এ কারণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দেশে গিয়ে চীনের বিশাল সৈন্যবল লাদাখ সীমান্ত থেকে সরিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। পাহারার জন্য সাধারণ সেনা মোতায়েন থাকবে সেখানে। ব্রিকস সম্মেলনে চীন বলেছে ভারত চিন প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। একে অপরের সহযোগী। এটা মেনে দুই দেশকে এগিয়ে যেতে হবে।
ব্রিকসের কারণেই নিষেধাজ্ঞায় টিকে রয়েছে রাশিয়ার অর্থনীতি। চীন ও ভারতের স্বাধীন পদক্ষেপ ভোতা করে দিয়েছে ডলারের দাপট। ব্রিকস দেশগুলোর অর্থনীতির আকার দিন কে দিন বেড়ে চলেছে। তার একমাত্র কারণ ব্রিকস দেশগুলোর ঐক্য।
লেখক সাংবাদিক, প্রধান প্রতিবেদক ঢাকা নিউজ২৪ডটকম, তারিখ: ১৯-৯-২০২৬




