নিউজ ডেস্ক: বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক পক্ষ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে চায় বিশেষ কমিটি।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি কমিটি।
এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট ও বিকল্প প্রস্তাব লিখিতভাবে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ ১০ বছরের মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে ভিন্নমত এসেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিরোধী দলসহ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিএনপির জুলাই জাতীয় সনদে থাকা ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কোনো বিষয়ে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেটিও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ জন্য বিরোধী দলকে কমিটিতে সদস্য দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও টেলিভিশন টকশোতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতামত নেওয়া হয়। এর আগে সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করে কমিটি। তাদের লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী পর্যায়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করবে কমিটি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের উত্থাপিত ও লিখিতভাবে জমা দেওয়া প্রস্তাবগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনার কথা জানিয়েছে কমিটি। ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন মত ও প্রস্তাবকে কীভাবে সমন্বয় করে একটি গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি করা যায়।
বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামাজিক শক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিদের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি ওই আন্দোলনে শহিদদের পরিবারের সঙ্গেও বৈঠক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি।
গত ১৭ বছরে ‘বঞ্চনার শিকার’ হয়েছেন- এমন ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সঙ্গেও মতবিনিময় করা হবে বলে জানান তিনি। সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কমিটির প্রতিবেদন তৈরি করার কথা রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কমিটির অবস্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে, কোথাও নোট অব ডিসেন্টও রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ-কোন ধাপ অনুসরণ করা হবে, তার বিকল্প প্রস্তাব প্রয়োজন। আলোচনার পর যে প্রস্তাবকে সুষ্ঠু ও উপযুক্ত মনে করা হবে, তা সংসদে বিবেচনার জন্য দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পদে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে ভিন্নমত এসেছে। কেউ কেউ মনে করেছেন, নির্দিষ্ট ১০ বছরের সীমা গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
কোনো প্রধানমন্ত্রী ভালো কাজ করলে জনগণ চাইলে তাকে আবারও নির্বাচিত করতে পারে—এমন মতও এসেছে।
তবে কমিটির সভাপতি জানান, তাদের দলের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেই অবস্থান থেকে তারা সরে আসেননি।
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র হওয়ায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি সংসদে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে, তৃতীয় বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধানসহ আরও দুটি সাংবিধানিক বিধানকে ভবিষ্যতে সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের আওতায় আনার প্রস্তাবের কথা জানানো হয়েছিল।
কমিটি জানিয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদই তাদের কাজের প্রধান ভিত্তি হলেও সনদের বাইরে আলোচনায় আসা বিষয়ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
আলোচনা শেষে কমিটির সভাপতি বলেন, বিশেষ কমিটির লক্ষ্য হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করা। বিভিন্ন পক্ষের লিখিত ও মৌখিক মতামত পর্যালোচনার পর প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধনী বিল আসবে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে এবং পরবর্তী জানুয়ারি অধিবেশনে বিল উত্থাপনের প্রত্যাশা রয়েছে বলে জানান তিনি।




