নিউজ ডেস্ক: গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন প্রচণ্ডভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলে আসছেন, অনেক কারখানায় সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সেপ্টেম্বর মাসের রপ্তানি আয়ে তার কিছুটা প্রমাণ মিলল। গত আগস্ট মাসের চেয়ে সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় কম হয়েছে ৪৯ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। মাসভিত্তিক রপ্তানি কমে আসার এ প্রবণতা অবশ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকেই। আগস্ট মাসেও জুলাইয়ের চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছিল ৩০ কোটি ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পুরোনো ও হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগস্ট মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৪৩ কোটি ডলার। জুলাই মাসে ছিল ৪৭৩ কোটি ডলার। জ্বালানি সংকট ছাড়াও সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি কম হওয়ার অন্য কারণটি হতে পারে ৩০ দিনের মাস। গত জুলাই ও আগস্ট ছিল ৩১ দিনের মাস। গত কয়েক বছরের রপ্তানি প্রবণতা অনুযায়ী দিনে গড়ে ১৫ কোটি ডলারের মতো পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।
অবশ্য গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসের রপ্তানি আয়ের দুর্বল ভিত্তির সুবাদে সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৬৩ কোটি ডলারেরও কিছু কম। একইভাবে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ডলার।
ইপিবির উপাত্ত বলছে, রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের আধিপত্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। গত প্রান্তিকে এই খাতের রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারে। ওষুধের রপ্তানি বেড়েছে ৪০ শতাংশ। পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে কোন কোন পণ্যে রপ্তানি কমেছে এবার সেই তথ্য প্রকাশ করেনি ইপিবি। এ কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। এত দিন ইপিবি বাড়া-কমা দুই ধরনের উপাত্ত দিয়ে পুরো রপ্তানি চিত্র তুলে ধরত তাদের মাসিক প্রতিবেদনে।
ইপিবির প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের পণ্যের শীর্ষ ২০ বাজারে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। অন্যান্য বাজারে বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশের মতো। শীর্ষ বাজারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫৯ কোটি ডলার। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ১৩৭ কোটি ডলারের। নামমাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে জার্মানিতে। দেশটি থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ কোটি ডলার।
শীর্ষ ২০ বাজারের মধ্যে গত প্রান্তিকে চারটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে। এর মধ্যে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ৪ শতাংশের মতো। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ ৫২ কোটি ডলার থেকে ৫০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ইতালিতে কমেছে ৬ শতাংশের মতো। ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামে রপ্তানি কমেছে ১৫ ও ১৪ শতাংশ হারে।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, জ্বালানি সংকটে গত তিন মাস ধরে প্রতি মাসেই প্রকৃত অর্থে আগের মাসের চেয়ে রপ্তানি কমছে। তবে গত বছরের এই মাসগুলোতে রপ্তানির দুর্বল ভিত্তির কারণে ইপিবির হিসাবে রপ্তানি বেশি দেখা যাচ্ছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি ও এমিটি ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী সমকালকে বলেন, গত মাসে গ্যাস-বিদ্যুতের প্রকট সংকট ছিল। সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি বেশির ভাগ কারখানা। সেখানে রপ্তানি বাড়ার কোনো কারণ নেই। সেপ্টেম্বর মাসে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ দেখা গেলেও রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মাসিক গড় রপ্তানির তুলনায় অনেক কম।
তিনি বলেন, মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বরে রপ্তানি তুলনামূলক অনেক কম থাকার কারণেই এবার এই প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ওই মাসে পোশাক রপ্তানি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের আগস্ট মাসে মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রভাব সেপ্টেম্বর এবং পরবর্তী মাসগুলো পর্যন্ত চলতে থাকে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নেও রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সে কারণে সেপ্টেম্বর মাসের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধিকে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং ৩ বিলিয়ন ডলারের এই রপ্তানি মাসিক গড় পোশাক রপ্তানির চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম হয়েছে রপ্তানি।



