প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাঁর হাত ধরে তৈরি হয় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, গবেষক ও অসংখ্য আলোকিত মানুষ। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই শিক্ষকেরই ঠিকানা যদি হয় বৃদ্ধাশ্রম, তাহলে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপককে আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে বসবাস করতে হয়েছে—এমন একটি সংবাদ ও ভিডিও আমাদের সামনে এসেছে। ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষকের বার্ধক্যের গল্প নয়; এটি আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রবীণদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার উপলক্ষ।
একজন অধ্যাপক তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও বিবেক গঠনে ব্যয় করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোর পথ দেখান। কিন্তু অবসর গ্রহণের পর যখন কর্মব্যস্ত জীবন থেমে যায়, তখন অনেকের জীবনে শুরু হয় নিঃসঙ্গতার অধ্যায়।
সন্তানদের শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে মা-বাবা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। অথচ জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সঙ্গ, যত্ন ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হন। কারও সন্তান বিদেশে, কারও সন্তান কর্মব্যস্ত, আবার কারও পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যায়। কখনো আর্থিক সংকট, কখনো অসুস্থতা, আবার কখনো সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে প্রবীণদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করলেই কাউকে পরিত্যক্ত বলা যায় না। অনেক প্রবীণ নিজের ইচ্ছায় সেখানে থাকেন। আবার কারও জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যাই হয়ে ওঠে নিরাপদ ও উপযুক্ত ব্যবস্থা। তাই কোনো ব্যক্তির প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনে পরিবারকে দোষারোপ করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রবীণদের অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উপেক্ষা করাও অমানবিক।
বার্ধক্য জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। আজ যিনি কর্মক্ষম, আগামী দিনে তিনিও অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন। সুতরাং প্রবীণদের যত্নকে করুণা বা দয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি তাঁদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।
আমাদের দেশে প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবীর অভিজ্ঞতা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের খোঁজখবর রাখার জন্য কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক যোগাযোগ, গবেষণা ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রবীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে সমাজও উপকৃত হবে।
প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে তিনটি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, পরিবারকে প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাঁদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমাজকে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও মানসম্মত পরিচর্যাও নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে প্রবীণদের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচর্যাব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা জোরদার করতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত।
একজন সাবেক অধ্যাপকের প্রবীণ নিবাসে বসবাসের খবর আমাদের আবেগাপ্লুত করতে পারে। কিন্তু শুধু আবেগ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তাঁর প্রকৃত জীবনপরিস্থিতি, পারিবারিক বাস্তবতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে থাকা অন্য প্রবীণদের সমস্যাও চিহ্নিত করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো প্রবীণ মানুষ একাকিত্ব, অসুস্থতা কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে অসহায় হয়ে পড়বেন না। যেখানে বৃদ্ধাশ্রম থাকবে পরিচর্যা ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে—অবহেলার প্রতীক হিসেবে নয়। যেখানে একজন শিক্ষক অবসর গ্রহণের পরও সম্মান, সঙ্গ ও নিরাপত্তা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারবেন।
একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; প্রবীণ, অসুস্থ ও অসহায় মানুষের প্রতি সেই জাতির আচরণও তার সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের প্রবীণ। অতএব, প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও যত্ন নিশ্চিত করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করা।
আমাদের প্রত্যাশা—কোনো শিক্ষক, গবেষক কিংবা সাধারণ মানুষ যেন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে নিজেকে সমাজের বোঝা মনে না করেন। বার্ধক্য হোক অবহেলার নয়, সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিক ভালোবাসার অধ্যায়।
লেখক — কলামিস্ট ও গবেষক




