ক্রীড়া ডেস্ক: পুরুষদের ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে কয়েকদিন পরই। আগামী ২৬ অক্টোবর জানা যাবে, কে হচ্ছেন উসমান দেম্বেলের উত্তরসূরি। তার আগে তুমুল আলোচনা কে এই পুরস্কার জিতছেন সেটি নিয়ে।
বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, এই দৌড়ে হ্যারি কেইন, মাইকেল অলিসে, লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও রদ্রি’র নামই এগিয়ে আছে।
ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং নির্ধারণ করবেন ১০০ সাংবাদিক। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান, দলীয় সাফল্য ও জেতা শিরোপা এবং মাঠে ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়ের আচরণ; এসব বিবেচনায় নিয়ে তারা ১ থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর দেবেন।
পুরস্কারটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বীকৃতিগুলোর একটি হিসেবে এর মর্যাদা অটুট। বিশেষ করে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো একাধিকবারের বিজয়ীরা ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের তারকাদের জন্য এটি আরও বড় আকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে ব্যালন ডি’অরের হিসাব সবসময় শুধু পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভোটের সময়সীমা গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত হলেও, ২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরুতে কারা কেমন খেলছেন, সেটিও ভোটারদের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই বিভিন্ন বেটিং প্রতিষ্ঠানের হিসাবে লামিনে ইয়ামালকে এবারের পুরস্কারের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর করা র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা ইয়ামাল এবার উঠে এসেছেন আরও ওপরে। তবে দ্য অ্যাথলেটিকের বিশ্লেষণে শীর্ষস্থানটি তার নয়। প্রতিবেদনটিতে ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা সেরা পাঁচ ফুটবলারের অবস্থান তুলে ধরা হলো।
১. হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড)
২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটিয়েছেন হ্যারি কেইন। বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে করেছেন ৫৬ গোল, সঙ্গে রয়েছে আটটি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের হয়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আরও ১১ গোল এবং ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে ছয় গোল যোগ করলে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ ম্যাচে ৭৩।
শুধু গোলের সংখ্যাই নয়, বড় ম্যাচেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়নস লিগের পাঁচটি নকআউট ম্যাচে করেছেন ছয় গোল। জার্মানির ঘরোয়া কাপ ডিএফবি-পোকালের ফাইনালেও করেছেন হ্যাটট্রিক।
বিশ্বকাপেও দারুণ ছন্দে ছিলেন কেইন। শেষ ৩২-এর ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেন। পরের রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষে একটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে গোলও করান।
সেমিফাইনালের পর চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বায়ার্নের বিদায় তার পুরস্কার জয়ের পথে বাধা হতে পারে। এত ভালো ব্যক্তিগত মৌসুম কাটিয়েও সবচেয়ে বড় দলীয় শিরোপাগুলো জিততে না পারা তার জন্য নেতিবাচক দিক।
তারপরও কেইনের পক্ষে যুক্তি জোরালো। ২০২৬-২৭ মৌসুমেও বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন নয় গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে নেশনস লিগের চার ম্যাচে করেছেন ছয় গোল।
২. মাইকেল অলিসে (বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স)
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে পেনাল্টি বাদ দিয়ে গোল ও অ্যাসিস্টের সম্মিলিত হিসাবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন মাইকেল অলিসে। লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে তার গোল ২০টি, অ্যাসিস্ট ৩২টি।
বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ সাতটি অ্যাসিস্টের রেকর্ডও গড়েছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। জাতীয় দলের হয়ে বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে আরও নয় ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি হ্যাটট্রিকও রয়েছে তার।
অলিসের খেলার ধরনেও রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। স্বাধীনতা, বুদ্ধিমত্তা ও দায়িত্বশীল আক্রমণাত্মক ফুটবলের সমন্বয়ে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণকে নিয়মিত চাপে রাখেন। বায়ার্ন ও ফ্রান্স; দুই দলের হয়েই বেশির ভাগ ম্যাচে সেরা অথবা দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন তিনি।
ওপেন প্লে কিংবা সেট পিস; দুই পরিস্থিতিতেই সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি রক্ষণেও অবদান রেখেছেন অলিসে। দলের আক্রমণকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অলিসের বড় প্রতিযোগিতাগুলোতে দলীয় সাফল্যের ঘাটতি রয়েছে। সেটি ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে বাধা হতে পারে। তবে গত মৌসুমে নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ইউরোপের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে চিনিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী এই তারকা।
চলতি মৌসুমেও তার ছন্দ অটুট। বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন নয় গোল, আর ফ্রান্সের হয়ে চার ম্যাচে চার গোল।
৩. লামিনে ইয়ামাল (বার্সেলোনা ও স্পেন)
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত হয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তার পারফরম্যান্সে ছিল আগের মৌসুমের তুলনায় আরও বড় উন্নতি। ২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৮ ম্যাচে ১৪ গোল ও ১৬টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন ইয়ামাল। পরের মৌসুমে মাত্র ৩৮ ম্যাচেই গোল করেন ২২টি, অ্যাসিস্ট ১৫টি।
তবে চোট তার ধারাবাহিকতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মৌসুমের শুরুতে পাবালজিয়া এবং শেষ দিকে হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায় মাঠে নামা সীমিত হয়ে পড়ে তার। বিশ্বকাপেও সেই চোটের প্রভাব দেখা যায়। সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে একটি গোল করেন ইয়ামাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সতীর্থকে দিয়ে গোল করালেও প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি তিনি।
তারপরও ইয়ামালের বয়স ও সামর্থ্য তাকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম বড় দাবিদার করে তুলেছে। চলতি মৌসুমের শেষেও তিনি কিশোরই থাকবেন। এমনকি ২০২৭ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়েও তাকে শুরু থেকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
২০২৬-২৭ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে মাত্র ১১ ম্যাচে করেছেন নয় গোল ও ১০টি অ্যাসিস্ট। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে স্পেনের হয়ে চার ম্যাচে করেছেন চার গোল। এমন পারফরম্যান্সের পর এবারের পুরস্কারেও ইয়ামালকে উপেক্ষা করা কঠিন। মৌসুমের শুরুতে তাঁর দুর্দান্ত ছন্দ তাকে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাতারে তুলে এনেছে।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে (রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স)
বিশ্বকাপে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। টুর্নামেন্টে ১০ গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতেছেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড; ২২ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ২২।
ফ্রান্সের জার্সিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও আরেকটি সফল ব্যক্তিগত মৌসুম কাটিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই তারকা। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল।
মৌসুমজুড়ে রিয়াল মাদ্রিদের নানা সমস্যার মধ্যেও অনেক ম্যাচে দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড় ছিলেন এমবাপ্পে। কোচ হিসেবে জাবি আলোনসোর অধীনে শুরু হওয়া মৌসুমের শেষটা হয়েছে আলভারো আরবেলোয়ার দায়িত্বে।
কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও দলীয় অর্জনের ঘাটতি তার ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে। টানা দ্বিতীয় মৌসুমে বড় কোনো ক্লাব শিরোপা না পাওয়া এবং বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থানে শেষ করা; দুটিই তার জন্য নেতিবাচক দিক।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে হোসে মরিনিওর অধীনে ক্লাব ফুটবলে ১১ ম্যাচে ১১ গোল করে শুরু করেছেন এমবাপ্পে। তবে রিয়াল মাদ্রিদের কৌশলগত ও সাংগঠনিক সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এমবাপ্পের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যে ব্যালন ডি’অর জয়ের যোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন কম। কিন্তু ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার জিততে তার অসাধারণ পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৫. রদ্রি (বার্সেলোনা ও স্পেন; মৌসুমের বড় অংশে ম্যানচেস্টার সিটি)
রদ্রির ২০২৫-২৬ মৌসুমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার লড়াই, আর দ্বিতীয় ভাগে নিজের পুরোনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার গল্প।
অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএল ছিঁড়ে যাওয়ায় আট মাস মাঠের বাইরে ছিলেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। ফেরার পরও হ্যামস্ট্রিং ও হাঁটুর সমস্যায় ভুগেছেন। ফলে ম্যানচেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ১৭ ম্যাচের ১১টিতেই খেলতে পারেননি তিনি।
তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ধীরে ধীরে নিজের সেরা রূপে ফিরতে থাকেন রদ্রি। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির শেষ মৌসুমে দলটি যখন আরও সরাসরি ও দ্রুতগতির ফুটবলে মনোযোগী হয়, তখন মাঝমাঠে ভারসাম্য ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মার্চ ও এপ্রিলে আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ ও কারাবাও কাপের ফাইনালে সিটির জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। কুঁচকির সমস্যার মাঝেও চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালে দুর্দান্ত খেলেন এই মিডফিল্ডার।
বিশ্বকাপ ছিল রদ্রির জন্য নিজেকে পুরোপুরি ফিরে পাওয়ার মঞ্চ। ৩০ বছর বয়সী এই তারকা স্পেনের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে দলকে শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন। টুর্নামেন্ট শেষে জেতেন গোল্ডেন বল; বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
স্পেনের বিশ্বকাপ জয় এবং রদ্রির ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অরের হিসাবেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পুরো মৌসুমে তার খেলার সময় ছিল মাত্র ২ হাজার ১৮৫ মিনিট, যা ৯০ মিনিটের হিসাবে ২৪টির কিছু বেশি পূর্ণ ম্যাচের সমান।
বর্তমানে বার্সেলোনায় খেলছেন রদ্রি। কাতালান ক্লাবটির হয়ে মানিয়ে নেয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। গত সপ্তাহে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৫-২ গোলের জয়ে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করেন এই মিডফিল্ডার।



