ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশপিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য

পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার সন্তানের অপরিহার্য কর্তব্য

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে পিতা-মাতার অধিকার, তাঁদের সেবাযত্ন এবং বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি কোমল আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী : ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মহান আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁদের সেবাযত্ন করা এবং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের উফ বলো না, তাঁদের ধমক দিয়ো না; তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৩)

এই আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা এবং কোনো ধরনের বিরক্তি প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসিরে পিতা-মাতার অধিকার ও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং তোমাদের পিতা-মাতার প্রতিও।’ (সুরা লুকমান, আয়াত ১৪)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি পিতা-মাতার অবদান স্বীকার করা এবং তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে পৃথিবীতে আনা, লালন-পালন করা, শিক্ষা দেওয়া এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা করার পেছনে পিতা-মাতার ত্যাগ ও পরিশ্রম রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি জানতে চাইলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন, যথাসময়ে নামাজ আদায় করা। এরপর কোন কাজটি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। এরপর কোন কাজটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। (সহিহ বুখারি)

এই হাদিসে যথাসময়ে নামাজ আদায়ের পর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

মায়ের অধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ

পিতা-মাতা উভয়েরই সন্তানের ওপর অধিকার রয়েছে। তবে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, দুগ্ধপান করানো এবং লালন-পালনের ক্ষেত্রে মায়ের বিশেষ ত্যাগের কারণে ইসলামে মায়ের অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারও তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসে মায়ের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব ও সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবার অধিকার উপেক্ষা করা যাবে। পিতা-মাতা উভয়ের সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব।

পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ

হাদিসে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্ব বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। জামে তিরমিজিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির সঙ্গে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।

আরেকটি হাদিসে পিতা-মাতাকে জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালন, তাঁদের সেবাযত্ন এবং তাঁদের সঙ্গে সদাচরণ জান্নাত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে তাঁদের অবহেলা করা ও কষ্ট দেওয়া গুরুতর অন্যায়।

তবে পিতা-মাতার আনুগত্যেরও সীমা রয়েছে। তাঁরা যদি আল্লাহর অবাধ্যতা বা অন্যায় কোনো কাজের নির্দেশ দেন, সে ক্ষেত্রে তাঁদের সেই নির্দেশ পালন করা যাবে না। কিন্তু এ কারণে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে শিরকের নির্দেশ মানতে নিষেধ করার পাশাপাশি দুনিয়ায় পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা লুকমান, আয়াত ১৫)

অমুসলিম পিতা-মাতার সঙ্গেও সদ্ব্যবহার

পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত ধার্মিকতা শর্ত নয়। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁর মা মুশরিক অবস্থায় তাঁর কাছে এলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চান, মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন কি না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ ইসলামের সর্বজনীন নৈতিক শিক্ষার অংশ। মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের প্রতি দায়িত্ব ও সম্মান বজায় রাখতে হবে।

বার্ধক্যে পিতা-মাতার যত্ন নেওয়া

পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় তাঁদের যত্ন নেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের সঙ্গে ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে কথা বলা সন্তানের বিশেষ দায়িত্ব।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আর তাঁদের জন্য ভালোবাসার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৪)

এ আয়াত সন্তানকে পিতা-মাতার প্রতি বিনয়ী হতে এবং তাঁদের জন্য দোয়া করতে শিক্ষা দেয়। তাঁদের কোনো প্রয়োজনকে তুচ্ছ মনে করা, বিরক্তি প্রকাশ করা কিংবা অসহায় অবস্থায় অবহেলা করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।

অনেক সময় বৃদ্ধ পিতা-মাতা অসুস্থতা, একাকিত্ব কিংবা দৈনন্দিন কাজের জন্য সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁদের সেবা করা শুধু আর্থিক দায়িত্ব নয়; সময় দেওয়া, কথা শোনা, মানসিক সাহস জোগানো এবং সম্মান বজায় রাখাও সদ্ব্যবহারের অংশ। পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের ঋণ বা অপূর্ণ দায়িত্ব যথাসম্ভব আদায় করা এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সন্তানের নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

পরিশেষে বলা যায়, পিতা-মাতার আনুগত্য, সেবাযত্ন ও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে আন্তরিকতা, ধৈর্য ও সম্মানের সঙ্গে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার এবং তাঁদের জন্য দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক, তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা, সিলেট।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular