বয়সের ভার, ঋণের কিস্তি আর তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ; নতুন বিধিমালায় বাড়ছে জীবিকার অনিশ্চয়তা
নাজমুল হোসেন : রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে যাত্রী নিয়ে ছুটে চলেছেন ৫৪ বছর বয়সী আবদুর রহমান। অটোরিকশার হ্যান্ডেলে দুই হাত, মনে সংসারের নানা হিসাব। তিন সন্তানই স্কুলে পড়ে। তাদের পড়াশোনার খরচ, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়—সবকিছুর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
দীর্ঘদিন দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন আবদুর রহমান। প্রায় ১০ বছর চালিয়েছেন প্যাডেলচালিত রিকশা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ আগের মতো সহজ ছিল না। তাই জীবিকার তাগিদে দুই বছর ধরে চালাচ্ছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
গাড়িটি কেনার জন্য বাড়ির কিছু গাছ বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি এনজিও থেকে নিয়েছেন ঋণ। সেই ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি ২ হাজার ৫০০ টাকা। রাতে সবুজবাগ এলাকার একটি গ্যারেজে গাড়ি রাখতে মাসে দিতে হয় আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রতিদিন সকাল ও বিকেল মিলিয়ে তাঁর আয় হয় প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে এই অর্থের পুরোটাই তাঁর হাতে থাকে না। প্রতিদিন রাস্তার খরচ বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ২০০ টাকা। ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রতিদিন আলাদা করে রাখতে হয় ৬০০ টাকা। বাকি অর্থ দিয়েই চালাতে হয় তিন সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ।
আবদুর রহমানের ভাষায়, নিজের গাড়ি থাকায় কোনোভাবে সংসার চলে। কিন্তু যাঁরা অন্যের গাড়ি ভাড়ায় চালান, তাঁদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। প্রতিদিন ৬০০ টাকা গাড়িভাড়া দিয়েই অনেক চালককে কাজ শুরু করতে হয়।
আয়-ব্যয়ের এই হিসাবের পাশাপাশি সড়কে চলাচল নিয়েও রয়েছে তাঁর দুশ্চিন্তা। আবদুর রহমান জানান, মতিঝিল, রাজারবাগ ও শাহবাগ এলাকায় অটোরিকশা চালাতে গিয়ে প্রায়ই পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়। তাঁর নিজের গাড়িও একবার আটক হয়েছিল। গাড়ি আটক হলে ছাড়াতে রেকার চার্জ হিসেবে দিতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকা। এ কারণে অনেক সময় সুযোগ বুঝে ফাঁকে ফাঁকে গাড়ি চালাতে হয়। তাঁর মতে, এমন অভিজ্ঞতা অনেক চালকেরই রয়েছে।
এরই মধ্যে সরকার জারি করেছে ‘ই-রিকশা বিধিমালা-২০২৬’। গত ২৯ অক্টোবর এসআরও প্রজ্ঞাপন ৩৮৪-আইন/২০২৬-এর মাধ্যমে জারি করা এই বিধিমালায় সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল, নিবন্ধন ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস করিডোর ও ফুটপাতে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালার কথা শুনেছেন আবদুর রহমানও। তবে নিবন্ধন ও গাড়ির কারিগরি মানদণ্ড নিয়ে তাঁর মনে রয়েছে কিছুটা সংশয়। তাঁর ধারণা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়িগুলোর জন্যই হয়তো এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। আগে থেকেই গাড়ি কিনে জীবিকা নির্বাহ করছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য নতুন নিয়ম কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে ভাবছেন তিনি।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বিধিমালা সংশোধনের দাবিতে সরব হয়েছেন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চালকেরা। গত ৩ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে সংগ্রাম পরিষদ। সেখানে নেতারা জানান, দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এ খাতের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ই-রিকশা বিধিমালা-২০২৬ সংশোধনের দাবিতে তাঁরা নয় দফা দাবি তুলে ধরেন।
আন্দোলনের খবরও শুনেছেন আবদুর রহমান। তবে তাঁর কাছে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামা বেশি জরুরি। কারণ, এক দিন আয় বন্ধ থাকলে সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর কথায়, ‘আমাদের তো আয় না করলে সংসার চলবে না। তাই এসব বিষয়ে বেশি খোঁজখবর রাখতে পারি না। ফাঁকে ফাঁকে গাড়ি চালাই।’
আবদুর রহমানের এই কথার মধ্যেই উঠে আসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল অনেক চালকের জীবনের বাস্তবতা। একদিকে সড়কে শৃঙ্খলা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা; অন্যদিকে এই পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের জীবিকা। নগর পরিবহনকে নিয়মের মধ্যে আনতে হলে এই দুই দিকই বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আবদুর রহমানের কাছে অটোরিকশা কেবল তিন চাকার একটি যানবাহন নয়। এটি তাঁর ঋণ পরিশোধের ভরসা, তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানোর মাধ্যম, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অবলম্বন। তাই সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এই পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। নিয়মের সঙ্গে জীবিকার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই নতুন বিধিমালার সুফল পৌঁছাতে পারে নগরের সাধারণ মানুষের কাছে।



