সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উপকূল মানেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙা ঘরবাড়ি আর লোনা পানির করাল ছোবল। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রতি বছরের এক অনিবার্য আতঙ্ক। আকাশে মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে—এই বুঝি আবার সব হারানোর পালা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূলরেখা ঘূর্ণিঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়কে আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ করে তুলছে।
উপকূলকে দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষা দিয়ে আসছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সিডর, আইলা বা আম্ফানের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। গাছপালা ও শ্বাসমূল জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমিয়ে মূল ভূখণ্ডকে রক্ষা করে।
তবে বন উজাড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও দূষণের কারণে সুন্দরবন নিজেই আজ হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাকৃতিক বর্ম দুর্বল হয়ে পড়লে উপকূলের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে।
উপকূল রক্ষার প্রথম প্রতিরক্ষা হলো বেড়িবাঁধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক জায়গায় বাঁধ ভেঙে গেছে, কোথাও আবার অস্তিত্বই নেই।
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় Cyclone Sidr, ২০০৯ সালের Cyclone Aila কিংবা ২০২০ সালের Cyclone Amphan—প্রতিটি দুর্যোগে বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হলেও তার বড় অংশ এখনো টেকসইভাবে সংস্কার করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, মেরামতের নামে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাজের মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ফলে জোয়ারের পানিতে নিয়মিত প্লাবিত হচ্ছে জনপদ, নষ্ট হচ্ছে ফসল ও মিঠাপানির উৎস।
ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আসে লোনা পানির ঢেউ। বাঁধ ভেঙে সেই পানি ঢুকে পড়ে কৃষিজমি, পুকুর ও বসতভিটায়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ—ফসলি জমি হয়ে পড়ে অনাবাদি, মিঠাপানির মাছ বিলুপ্তির পথে।
অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন। যদিও এটি স্বল্পমেয়াদে লাভজনক, তবে মাটির উর্বরতা আরও কমিয়ে দিচ্ছে এবং লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে এক দুষ্টচক্র।
প্রতিটি দুর্যোগের পর শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক আঘাতও বহন করতে হয় উপকূলবাসীকে। শিশুদের মনে তৈরি হয় স্থায়ী আতঙ্ক, আর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বাড়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং শিক্ষা ব্যাহত হওয়া তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।
জীবিকা হারিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ উপকূল ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরের বস্তিগুলোতে গড়ে উঠছে জলবায়ু-শরণার্থীদের নতুন বাস্তবতা, যেখানে অপেক্ষা করে আরেক ধরনের সংগ্রাম।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও হার মানেনি উপকূলের মানুষ। তারা নিজেরাই খুঁজে নিচ্ছে টিকে থাকার পথ—উঁচু ভিটা, ভাসমান কৃষি, লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল, কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি।
এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, তারা কেবল ভুক্তভোগী নয়—বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ত্রাণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। টেকসই বেড়িবাঁধ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজ বেষ্টনী এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় উপকূলীয় বাঁধ আরও উঁচু ও শক্তিশালী করে নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।



