নিউজ ডেস্ক: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বেহাত হয়ে গেছে এবং বিদ্যমান পুরোনো বন্দোবস্তকে ভাঙার ন্যূনতম যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা সংকুচিত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘গণভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও সিরাজুল আলম খানের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের ন্যূনতম পুনর্গঠনের যে অভিপ্রায় বা বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পক্ষে মতামত দিয়েছিল। কিন্তু সেই সংস্কার প্রক্রিয়া আজকে থমকে আছে। গণঅভ্যুত্থানে যে শ্রমিক, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ রাজপথে রক্ত দিল, ফ্যাসিস্ট পালানোর পর গঠিত সংস্কার কমিশনে তাদের কোনো জায়গা হলো না, তাদের মতামত নেওয়া হলো না। সুশীল রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতার অংশীদার বনে গেলেও মেহনতি মানুষ বঞ্চিতই থেকে গেল।’
সীমান্তের অস্থিরতা ও দেশের অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সীমান্তে বর্তমানে এক অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রামবাসী ও বিজিবি মিলে সারারাত সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। নোম্যানস ল্যান্ডে নারী, শিশু, পুরুষ দিন-রাত কাটাচ্ছে। অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কড়া কোনো বার্তা দেওয়ার তথ্য আমাদের জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক সূচকগুলো নিম্নগামী, আরএমজি খাতে রপ্তানি কমছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গতকাল মৌচাক মার্কেটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দেশজুড়ে খুন, গুম ও নারী-শিশু নির্যাতন মহামারি আকার ধারণ করেছে।’
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘সিরাজুল আলম খানের চিন্তা অত্যন্ত সাহসী ও প্র্যাগমেটিক ছিল। তবে তিনি যেটিকে ‘অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র’ বলেছেন, সেটিকে আমি ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা থাকলেও তা চর্চা করা হয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। তাঁর এই চিন্তার পেছনে ১৯১৭ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা চর্চার এক ধরনের প্রভাব ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রক্তক্ষয়ী পথ পরিহার করে ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নির্বাচনের প্রস্তাব এনেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমরা যাদের নিয়ে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ গঠন করেছিলাম, তাদের অনেকেই সামান্য আসন বা পাতি-মন্ত্রিত্বের লোভে বিকল্প রাজনীতি গড়ার এই সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়েছেন। ৯০ বা ২৪—প্রতিবারই অভ্যুত্থানের পর বিজয় জনগণের হাতছাড়া হয়ে কয়েকজনের কাছে চলে যায়।’
আলোচনা সভার সভাপতির বক্তৃতায় জেএসডির সিনিয়র সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান আজীবন একটি জাতীয় ঐক্যের কথা বলে গেছেন—যা শোষিত ও মেহনতি মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে। ২৪-এর বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থান সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল বলেই স্বৈরাচারের পতন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শাসন ব্যবস্থার যদি আমূল সংস্কার না হয়, তবে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পুনরায় নতুন স্বৈরাচারের জন্ম হবে।’
সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জেএসডির নেতা শহীদুল্লাহ ফরায়জী। এছাড়া আরও বক্তব্য দেন জেএসডি’র নেতা ডা. হেলালুজ্জামান, চর্চার সম্পাদক সোহরাব হোসেন প্রমুখ।



