সংঘাতের পাঁচ দিন পরও সংলগ্ন জোবরা গ্রামে যেতে পারেননি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়া ছাড়াই আগামীকাল রোববার থেকে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রমের ঘোষণা দিয়েছে।
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জোবরা গ্রামে বাসাবাড়ি ও কটেজ ভাড়া করে পড়ালেখা করে আসা শিক্ষার্থীরা। এ সংখ্যা কমবেশি পাঁচ হাজার। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংঘাতের ঘটনায় উত্তেজনা রয়েই গেছে। গ্রামবাসীও ফুঁসছে। বই-খাতাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গ্রামে। বিভিন্ন জায়গায় কার্যত শিক্ষার্থীরা উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বাসস্থানে ফেরার উদ্যোগ না নিয়ে ক্লাসে ফেরাতে চাচ্ছে। এটি সম্ভব নয়।
গত ৩০ আগস্ট রাত থেকে চবি শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে টানা সংঘর্ষ হয়। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। সংঘাতের মুখে নিরাপত্তাহীতায় জোবরা গ্রাম থেকে চলে আসেন শিক্ষার্থীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুর কক্ষ ভাগাভাগি ও পরিচিতজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। বাসস্থানে ফিরতে সংশ্লিষ্ট বাড়ি ও কটেজ মালিকদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা দিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
ফিরতে না পারার জন্য প্রশাসনের উদাসীনতাকে দুষছেন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তাওহিদুল ইসলাম শাওন বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় জোবরা গ্রামে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফোন করে শিক্ষার্থীদের না ফিরতে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ নয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রশাসন ক্লাস শুরুর নোটিশ দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দায়সারা বাসায় ফিরতে বলেছে। নিরাপত্তার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কীভাবে ফিরব, ক্লাসে আসব কেমন করে, বুঝতে পারছি না।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন শিহাব বলেন, সংঘর্ষের রাতেই জোবরা গ্রামে বাছা মিয়ার মোড়ের বাসা ছেড়ে চলে আসি। টানা পাঁচ দিন বাইরে কাটাচ্ছি। আগামী মাসে পরীক্ষা, সবকিছু বাসায়। পড়াশোনা করতে না পারলে পরীক্ষায় অংশ নেব কীভাবে? বাড়ির মালিকও স্পষ্ট বলেছেন– নিরাপত্তা দিতে পারবেন না।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ রিমন হক বলেন, ‘প্রশাসন গ্রামবাসীর সঙ্গে মিটিং করে সমাধান করবে বলেছিল। কিন্তু কিছুই করেনি। আমরা বাসাতেই যদি ফিরতে না পারি, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেব কীভাবে?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, বাসাবাড়ি ও কটেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা যোগাযোগ রাখছেন। শনিবার সকাল ১০টায় কটেজ মালিক ও স্থানীয় গণ্যমান্যের সঙ্গে কমিটির বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে শিক্ষার্থীদের জোবরা গ্রামে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি
গ্রামবাসীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘাতের জন্য প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডির ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার প্রক্টর অফিসের সামনে ‘অধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনে এটিসহ সাত দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষার্থী উম্মে সাবাহ তাবাসসুম শুদ্ধতা, ইশতিয়াক আহমেদ, সুসান কবির, ওমর সমুদ্র, সাদিয়া আফরিন প্রমুখ। তারা বলেন, সংঘর্ষের সময় বারবার ফোন করেও প্রক্টরদের পাওয়া যায়নি। দুই ঘণ্টা পর তারা ঘটনাস্থলে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অথচ পরে নিজেদের ব্যর্থতার দায় আড়াল করতে শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আহতদের চিকিৎসায় প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও অ্যাম্বুলেন্সের অভাব এবং হামলাকারী দারোয়ানের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া প্রমাণ করে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করে দায় এড়াচ্ছে। মামলায় প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আড়াল করে অনেক নির্দোষ ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে অন্যতম হলো আহতদের মানসম্মত চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রকৃত সন্ত্রাসীদের বিচার, দ্বন্দ্ব নিরসনে সমন্বয় কমিটি গঠন, সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের রোডম্যাপ ঘোষণা। শনিবারের মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দেন তারা।
যুবলীগ নেতার সহযোগী গ্রেপ্তার
সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হাটহাজারী থানায় একটি মামলা ও জিডি করেছে। মামলায় ৯৫ জনের নাম উল্লেখ এবং জিডিতে অজ্ঞাতপরিচয় অন্তত এক হাজার ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার ৫৬ নম্বর আসামি মো. হান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গতকাল র্যাব-৭-এর মিডিয়া উইং জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাটহাজারীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে হান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়। হান্নান ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা হানিফ এবং ছাত্রলীগ নেতা ইকবালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাদের নির্দেশেই তিনি স্থানীয়দের সংগঠিত করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অংশ নেন।
হাসপাতালে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা
সংঘর্ষে গুরুতর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম সফরে এসে তিনি নগরের বেসরকারি হাসপাতাল পার্কভিউতে চিকিৎসাধীন দুই শিক্ষার্থীকে দেখতে যান। এর মধ্যে একজন আইসিইউতে ও অন্যজন কেবিনে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।



