চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: সরকারের পক্ষ থেকে নৌপথ নিরাপদ করাসহ ফেডারেশনের চার দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে নৌযান শ্রমিকের ধর্মঘট স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর থেকেই ১৬ লাখ টন পণ্য নিয়ে নদী এবং সাগরে নোঙর করে থাকা জাহাজ গুলোতে রাতেই কাজ শুরু হয়েছে। এতে করে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাবের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল তা থেকে নিস্তার মিলল।
গতকাল শনিবার রাত নয়টার দিকে ধর্মঘট স্থগিত করার কথা জানান বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি মো. শাহ আলম।
এর আগে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে গত রাতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে শ্রমিক নেতারা কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ রোববার নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রতিনিধির সাথে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করার কথা রয়ে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার চাঁদপুরের মাঝেরচরে মেঘনা নদীতে নোঙর করে রাখা জাহাজ এমভি আল–বাখেরা থেকে পাঁচ শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় আরও দুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে অর্নিদিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেন নদীপথে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত জাহাজের শ্রমিকেরা।
অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিনে গত রাতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে মহাপরিচালক কমডোর মাকসুদ আলমের উদ্যোগে উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠিত বৈঠকে কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে শ্রমিকদের দাবিদাওয়াসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে দ্রততম সময়ের মধ্যে ৭ খুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়। একইসাথে নৌ পথ নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়। নিহত শ্রমিকদের পরিবারপ্রতি ২০ লাখ টাকা প্রদানের যে দাবি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল তার সাথে একমত পোষণ করে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রমিকদের পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কোনো পরিবারে উপযুক্ত কেউ থাকলে তাকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে এককালীন অর্থ প্রদানের বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই টাকা কোন ফান্ড থেকে কিভাবে দেওয়া হবে, কত টাকা দেওয়া হবে, জাহাজের মালিক কত টাকা প্রদান করবেন, সরকার কত টাকা দিতে পারবে প্রভৃতি আলোচনার মাধ্যমে ঠিকঠাক করা হবে।
উল্লেখ্য, এমভি আল বাখেরা জাহাজে মাস্টারসহ ৭ শ্রমিককে খুনের ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারের জন্য সরকারিভাবে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা, সব নৌ পথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ডাকাতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ চার দফা দাবিতে সারা দেশে নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতি আহ্বান করা হয়। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশের নদী পথে মালবাহী, তেল–গ্যাসবাহী, বালুবাহীসহ সব প্রকার পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। তবে যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোকে কর্মবিরতির বাইরে রাখা হয়েছিল।
এদিকে কর্মবিরতির কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা হওয়ায় স্বস্তি নেমে এসেছে ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ জাহাজ মালিকদের মাঝে। এই ঘোষণার ফলে কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানকারী বিদেশি অন্তত ৩০টি মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস এবং দেশব্যাপী পরিবহন গত রাত থেকে শুরু হয়েছে। এসব জাহাজে অন্তত ৬ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে। বহির্নোঙরের পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ অভ্যন্তরীণ নৌরুটে বন্ধ থাকা পণ্য পরিবহন গতকাল রাত থেকে পুরোদমে শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি ঘাটে ৭৩৮টি লাইটারেজ জাহাজে আমদানিকৃত ১০ লাখ ১১ হাজার ২৩৫ টন বোঝাই থাকা পণ্য খালাস শুরু হয়েছে। এতে করে হুমকির মুখে পড়া ভোগ্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিকভাবে চালু থাকবে। দ্রব্যমূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল সরকারি উদ্যোগের ফলে তারও অবসান হয়েছে।
বহির্নোঙরের কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন অ্যাংকরেজে অবস্থানকারী ৩০টি মাদার ভ্যাসেল (বড় জাহাজে) আমদানিকৃত অন্তত ৬ লাখ টন পণ্য খালাসের যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তারও অবসান হয়েছে। একইসাথে বিদেশি মাদার ভ্যাসেলগুলোর প্রতিটির জন্য দৈনিক ২০ হাজার ডলার ফিঙড অপারেটিং কস্ট বা এফওসি গচ্ছা যাচ্ছিল; দুদিনের মাথায় তার থেকেও দেশ নিস্তার পাচ্ছে। ইতোমধ্যে উক্ত ৩০টি জাহাজ খাতে দেশের অন্তত ১৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা গচ্ছা দিতে হবে বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কর্মবিরতি লাগাতার হলে এই অংক আরো বেড়ে যেত।
বিদেশি জাহাজের পেমেন্ট বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় উল্লেখ করে একাধিক আমদানিকারক বলেছেন, এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।কর্মবিরতি স্থগিত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স এসোসিয়েশন অব চিটাগাং–আইভোয়াকের সহসভাপতি ও মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে সংকটের সুরাহা হলো। শ্রমিক নেতাদের সাথে আলোচনা শুরু করতে বিলম্ব হলে দেশ আরো ক্ষতির মুখে পড়ত।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মাকসুদ আলম বলেন, আমরা সবাই মিলে আলোচনা করে শ্রমিকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। উনারা সন্তুষ্ট হয়ে কর্মসূচি স্থগিত করে অবিলম্বে কাজে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৈঠকের পরপরই সারা দেশে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে দেখা দেওয়া অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে।



