মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন দরজা খুলেছে, আন্তর্জাতিক চাপে গোপন বৈঠক, এবং এক ভয়ঙ্কর রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের দুর্বৃত্তায়নে ভরা। আমিন-স্বপনের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি অপ্রতিরোধ্য মানবসম্পদ সিন্ডিকেটের দাপটে হাজারো শ্রমিক নিঃস্ব হয়েছে। তবে এখন কূটনৈতিক কৌশল এবং গোয়েন্দা নজরদারিতে সেই সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন, স্বচ্ছ এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হলো।
আমিন ও স্বপনের নেতৃত্বাধীন চক্র দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে ৫-৬ লাখ টাকা করে আদায় করত, যা প্রকৃত খরচের কয়েক গুণ বেশি। এই সিন্ডিকেটের শিকারে পরিণত হয়ে অনেক শ্রমিক বাড়ি-জমি বিক্রি করে পথে বসেছে। অথচ এসব কর্মীকে পাঠানো যেতো সরকারের নির্ধারিত সীমিত খরচে।
তাদের পেছনে ছিল মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, যারা কমিশনের ভাগ নিয়ে এই সিন্ডিকেটকে নিরাপত্তা দিত।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি এই সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত ছিলেন সাবেক মালেশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার শহিদুল ইসলাম, সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে চাকুরী থেকে বহিস্কৃত সাবেক লেবার মিনিস্টার নাজমুশাহাদাৎ, বর্তমান হাইকমিশনার শামীম আহসান, সাবেক ডেপুটি হাইকমিশনার খুরশেদ আলম খাস্তগীর,দূতালয় প্রধান প্রণবকুমার, হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম, প্রথম সচিব (লেবার) সুমন চন্দ্র দাস সহ আরও অনেকে, যারা আমিন-স্বপনের ‘লাইসেন্সধারী এজেন্সি’কে বিশেষ সুবিধা দিতে সক্রিয় ছিলেন।
বিস্ময়করভাবে, প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয় তা কোনো গণমাধ্যমকে না জানিয়ে সম্পুন্ন রূপে গোপন রাখা হয় । অথচ ওই বৈঠকেই সিন্ডিকেটকে পুনর্বহাল করার গোপন পরিকল্পনা হয় বলে দাবি করছে গোয়েন্দা সূত্র।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি বরাবরই মানবিক নীতির পক্ষে, এই সিন্ডিকেটের গভীরতা দেখে চমকে ওঠেন। তাৎক্ষণিকভাবে সিন্ডিকেট বাতিল করে নতুন সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগের নির্দেশ দেন তিনি।
শুধু BOESL (বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড) এর মাধ্যমে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হবে। নিয়োগ চলবে মালয়েশিয়া সরকারের FWCMS (Foreign Workers Centralized Management System) এর আওতায়। অর্থাৎ, প্রতিটি পদক্ষেপ এখন ডিজিটাল, যাচাইযোগ্য ও সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে ০১ অগাস্ট বলা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায় কোনো দালাল বা সিন্ডিকেটের স্থান নেই। কর্মীদের যাবতীয় তথ্য, কোটা, কোম্পানির প্রোফাইলসহ ১৫টি নথিপত্র জমা না দিলে নিয়োগ হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যত উদ্যোগ নিচ্ছে, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির গাঁথুনি যদি ভাঙা না হয়, তবে সিন্ডিকেট হয়তো নতুন মুখে ফিরে আসতে পারে। এজন্য প্রয়োজন গণপর্যায়ে সচেতনতা, কূটনৈতিক স্বচ্ছতা, এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে সুখবর। বিদেশগামী শ্রমিকদের নয় এটা ছিল সিস্টেমের ভেতরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এক জেতা যুদ্ধ।



