ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআবহাওয়া/পরিবেশপানি কমতেই কক্সবাজারে বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ দৃশ্যমান

পানি কমতেই কক্সবাজারে বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ দৃশ্যমান

নিউজ ডেস্ক: টানা আট দিনের ভয়াবহ বন্যার পর কক্সবাজারে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। সোমবার থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকায় প্লাবিত এলাকাগুলোর পানি কমলেও এখন দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার রেখে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ। পানি যত নামছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে সড়ক, সেতু, বসতবাড়ি, কৃষি, মৎস্য খাত ও বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।

চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, কুতুবদিয়া, উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন সড়ক এবং মোট ৩৭টি সেতু-কালভার্টও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পেকুয়া উপজেলার ৯৫ শতাংশ, মাতামুহুরীর ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁও উপজেলারও বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে যায়।

বন্যা ও পাহাড়ধসজনিত বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা এবং ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে চাল, শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনো প্রকট। অসংখ্য টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্গম কয়েকটি এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে নিহত ও আহত স্থানীয়দের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ মোকাবিলায় ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন, ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন বিতরণ, ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান সরবরাহ করা হয়েছে।

এদিকে জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাদা মাছ, চিংড়ি ও মাছের পোনাসহ প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩০৩টি খামারের ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু এবং ৩৩০টি পোলট্রি খামারের প্রায় ৯৮ হাজার হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ এবং একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular