নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরেও দুর্বল থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। একই হার আগের অর্থবছরেও প্রত্যাশা করা হয়েছে। এরপর ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। অর্থাৎ আগামী দুই অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে মন্থরতা শুরু হয়েছে, তার পেছনে দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের ঝুঁকি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে। বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে চাপে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে প্রত্যাশিত গতি আসার কথা ছিল, তা এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি। ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি এবং কাঠামোগত বাধা পুনরুদ্ধারকে ধীর করে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিল্প খাতের দুর্বলতাও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে এবং বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মহামারির পর প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে সংকোচন দেখা গেছে। এর সঙ্গে দুর্বল ঋণপ্রবাহ, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উৎপাদন ও বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
ব্যাংকিং খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। জুন ২০২৬-এ ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ডিসেম্বর ২০২৫-এর ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা ঋণ বিতরণ ও আর্থিক মধ্যস্থতা ব্যাহত করছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও প্রভাবিত করছে।
জ্বালানি সংকটও প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি দামের চাপ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে এবং সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগোলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের রাজস্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, যা বিশ্বে অন্যতম নিম্ন হার। এর ফলে সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় ও উন্নয়ন বিনিয়োগের জন্য আর্থিক পরিসর সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সময়ে ওই অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি।
অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানেও পড়েছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নারীরা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। ফলে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সব সূচকই নেতিবাচক নয়। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই পরিস্থিতি সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক চিত্র বাংলাদেশের তুলনায় বেশ শক্তিশালী। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশই ২০২৭ সালে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি করবে বলে আঞ্চলিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। সরকারি সহায়তা আরও সুনির্দিষ্টভাবে পৌঁছে দিতে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামনে বাংলাদেশের জন্য পুনরুদ্ধারের পথ সহজ নয়। জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটাই নির্ভর করবে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। অন্যথায় কাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।-
এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের সামনে কাজ হবে স্থিতিশীলতা ধরে রেখে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে গতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও দরিদ্র মানুষের সুরক্ষাকেও সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে হবে।




