ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামভারত - বাংলাদেশ সীমান্ত উত্তাপ: সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, হোক সহযোগিতার

ভারত – বাংলাদেশ সীমান্ত উত্তাপ: সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, হোক সহযোগিতার

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধন, ভাষা ও সংস্কৃতির নৈকট্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থ—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বন্ধুসুলভ।

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক কিছু ঘটনা সেই সম্পর্কের ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা ‘পুশ-ব্যাক’ ইস্যু, বাংলাদেশের একজন উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিকে দিল্লি বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিককে তলব করে প্রতিবাদ জানানো এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক অস্বস্তি নয়; বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে জমে ওঠা অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

প্রশাসনিক ত্রুটি

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান ভারত সফরে গিয়ে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, তাঁর সফর সম্পর্কে পূর্বেই কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল। পরে তিনি প্রতিবাদস্বরূপ ভারত সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসেন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এমন আচরণ সাধারণত অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে অভ্যর্থনা জানানোর পরিবর্তে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়; এটি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিও অসম্মান হিসেবে দেখা হতে পারে।

এর পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় উপ-হাইকমিশনারকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।

সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার। এই সীমান্ত বরাবর দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানবপাচার এবং সীমান্ত হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, ভারত যথাযথ যাচাই-বাছাই ও দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অপরদিকে ভারত বলছে, তারা অবৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করে ফেরত পাঠাতে চায় এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর আগে তাঁর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় এটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সীমান্তকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সম্পর্কের অবনতির কারণ 

দুই দেশের বর্তমান সম্পর্ক বোঝার জন্য সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং জাতীয়তাবাদী বক্তব্য আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণ বর্তমান উত্তেজনাকে প্রভাবিত করছে—
প্রথমত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতকে নতুন বাস্তবতায় খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ঘিরে কূটনৈতিক জটিলতা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তৃতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আবার সামনে চলে এসেছে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রভাবও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

‘সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান’

বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক আয়তন, অর্থনৈতিক শক্তি ও সামরিক সক্ষমতার বিচারে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শক্তি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল শক্তির ভারসাম্যে পরিচালিত হয় না; এটি পারস্পরিক স্বার্থ, মর্যাদা ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ভারতের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য অংশ।

তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ‘বড়-ছোট’ মানসিকতা নয়; বরং ‘সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান’।

জনগণের জন্য বার্তা

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তিনটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
প্রথমত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে একটি সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে।
দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘাটতি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই দেশের সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা।
তৃতীয়ত, উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়; বরং সংলাপ, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

আশার বাণী

ইতোমধ্যে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যৌথ টহল ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ইতিহাসের পরীক্ষায় বহুবার উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কখনো বর্তমানের বিকল্প হতে পারে না। অতীতের বন্ধুত্বকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ধরে নেওয়া ভুল হবে।

কূটনীতিতে অহংকার নয়, আস্থা গুরুত্বপূর্ণ; প্রভাব নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাই টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি। আজকের উত্তেজনা যদি দ্রুত ও বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করা না হয়, তবে তা শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

প্রতিযোগিতার নয় সহযোগিতার

জনগণ চায়—প্রতিবেশী সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, হোক সহযোগিতার।

দুই দেশের রাজনৈতিক বিজ্ঞ নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার ওপরই নির্ভর করছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular