নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদাতা : লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সড়ক নিয়ে দুর্ভোগ কাটছে না। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও খালের পাশে গাইড ওয়াল না থাকায় অতিবৃষ্টি ও পানির স্রোতে সড়কের পাড় ধসে পড়ছে। আবার কোথাও নির্মাণকাজ শুরু করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় কাদা-পানিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর অবস্থাও নাজুক। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, পথচারী ও যানবাহনের চালকদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ধীরগতি, প্রয়োজনীয় গাইড ওয়াল নির্মাণ না করা, সময়মতো সংস্কার না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে সড়কগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে।
রায়পুর শহরের থানামোড় শহীদ ওসমান চত্বর থেকে নর্দমা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙন, খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে এসব গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া পাটোয়ারী রাস্তার মাথা থেকে স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করেন। কাজী ফারুকী কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহার করতে হয়। গর্ত এড়িয়ে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
উপজেলার ৯ নম্বর দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নের মিতালী বাজার-চর কাসিয়া সড়কটি প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। সড়কের এক পাশে খাল রয়েছে। বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় গাইড ওয়াল না থাকায় অতিবৃষ্টি ও পানির স্রোতে সড়কের পাড় ভেঙে যাচ্ছে। কোথাও পিচের নিচের মাটি সরে গেছে, আবার কোথাও সড়কের কিনারা খালের দিকে ধসে পড়েছে। এতে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গাইড ওয়াল নির্মাণ না করেই সড়কের কাজ করায় বর্ষা মৌসুমে পাড় ধসে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি স্থানে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে মাটি ও বালু ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। তবে এতে স্থায়ী সমাধান হয়নি।
মিতালী বাজার মডেল একাডেমির এক শিক্ষার্থী বলেন, “এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় লাগে। বৃষ্টি হলে রাস্তার পাড় আরও ভেঙে যায়। দ্রুত এটি ঠিক করা দরকার।”
রায়পুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “আমি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। স্থানীয়রা লিখিত আবেদন করলে এলজিইডির সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি মাসিক সভাতেও আলোচনা করা হবে।”
অন্যদিকে উপজেলার ১ নম্বর চর আবাবিল ইউনিয়নের ঝাউডগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস আগে সড়কের মাটি কেটে কিছু বালু ফেলে রাখার পর থেকে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সড়কের মাঝখানে মাটি কেটে রাখায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কটি কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে সড়ক পড়ে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী বলেন, “এখন বর্ষার মৌসুম। বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমে, ফলে কাজ করতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমি ঠিকাদারকে পানি ড্রেন আউট করার নির্দেশনা দিয়েছি। তবে আমরা দ্রুতগতিতে কাজটি শেষ করার চেষ্টা করছি।”
কাজটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুলজার ট্রেডার্সের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোনে কল রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শুধু নির্মাণাধীন সড়ক নয়, দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বাসাবাড়ি-হায়দারগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অবস্থাও নাজুক। চাঁদপুরের হাইমচর ও ফরিদগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষের রায়পুরে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া হায়দারগঞ্জ-চরভৈরবী, হায়দারগঞ্জ-হাজিমারা, মোল্লারহাট এবং ঝাউডগী-কেম্পেরহাট সড়কের বিভিন্ন অংশেও সংস্কারের অভাবে দুর্ভোগের অভিযোগ রয়েছে। বর্ষায় গর্তে পানি জমে যাওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, এসব সড়কে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো কোনো সড়ক সংস্কারের কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ভেঙে যায়। নিম্নমানের কাজ ও যথাযথ তদারকির অভাবের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয়দের দাবি, সাময়িকভাবে ইট-বালু ফেলে সংস্কার না করে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করতে হবে। খালের পাশে প্রয়োজনীয় গাইড ওয়াল নির্মাণ, নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করা এবং চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অতিবৃষ্টি ও বর্ষার পানিতে সড়কের আরও অংশ ধসে পড়তে পারে। এতে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।




