মানুষের মনের অন্দরে জমে থাকা কত না না-বলা কথা, একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি আর অনুচ্চারিত অনুভূতিগুলো যখন রঙের ছোঁয়ায় কিংবা সূচের ফোঁড়ে মূর্ত হয়ে ওঠে, তখন তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন। এমনই এক গভীর অনুভূতির শিল্পভাষার দেখা মিলল রাজধানীর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায়।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে পর্দা উঠেছে দলীয় শিল্পপ্রদর্শনী ‘আনটোল্ড স্টোরির’।
সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্স দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ফ্রেদেরিক ইনজা।
‘আনটোল্ড স্টোরি’ প্রদর্শনীটি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সমকালীন শিল্পকর্ম ও শিল্পীর বইয়ের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। মানুষের জীবনের একান্ত এবং প্রায়শ অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতাগুলোকে শিল্পমাধ্যমে ফুটিয়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
এই শিল্পযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন প্রতিশ্রুতিশীল ছয়জন দলীয় শিল্পী- এষা আহমেদ, ফৌজিয়া মাহিন চৌধুরী, কাজমিন সামিয়া, সুলেখা চৌধুরী, সুমনা আক্তার ও সুরভী আক্তার। তাদের সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছেন একদল প্রতিভাবান অতিথি শিল্পী- আলিয়া কামাল, অর্পিতা সিংহ, মাহমুদা সিদ্দিকা, রাফিয়া মাহজাবীন, ঋতুপর্ণা সাহা ও ভেনিসা কায়সার। এই দুই ধারার শিল্পীদের কাজের বৈচিত্র্য প্রদর্শনীটিকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
মূল দলীয় শিল্পীরা দীর্ঘ এক বছর ধরে একটানা শিল্পীর বইয়ের মাধ্যমে এই বিষয়বস্তু নিয়ে নিবিড় সাধনা করেছেন। অন্যদিকে, অতিথি শিল্পীরা অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের পরিসরে একই মৌলিক ভাবনাকে তাদের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন। তাদের এই দুই ধারার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে ধারণ, পুনর্ব্যাখ্যা এবং প্রকাশের বহুমুখী পদ্ধতিগুলোকে দর্শকের চোখের সামনে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করে।
চিত্রকলা, ড্রয়িং, কোলাজ, সেলাই, টেক্সটাইল, সংগৃহীত উপকরণ এবং পরীক্ষামূলক বইয়ের নানা রূপের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন স্মৃতি, পরিচয়, ঐতিহ্য, হারানো বোধ, সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং নানা জীবন-অভিজ্ঞতার পসরা। প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও স্মৃতি রূপান্তরিত হয়েছে দৃশ্যমান এবং বস্তুগত শিল্পভাষায়।
এবারের এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বা কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘শিল্পীর বই’; যা প্রথাগতভাবে কেবল পড়ার মতো কোনো বস্তু নয়, বরং এক অন্তরঙ্গ শিল্প-পরিসর। শিল্পীরা এই বইগুলোর মাধ্যমে স্মৃতির খণ্ডাংশ অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষণ করেছেন; ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীর পুনর্পাঠ করেছেন। সাধারণ ভাষায় বা প্রচলিত অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করা কঠিন এমন জটিল ও সূক্ষ্ম মানবীয় অভিজ্ঞতাকে তারা বইয়ের ক্যানভাসে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছেন।
শুধু বইয়ের পৃষ্ঠার ভেতরেই নয়, এর বাইরেও প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত নানা শিল্পকর্ম ব্যক্তিগত আখ্যানের খণ্ডাংশকে সফলভাবে টেনে এনেছে গ্যালারির প্রশস্ত পরিসরে, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিগত স্মৃতি একীভূত হয়েছে বৃহত্তর সম্মিলিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনীর দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।




