ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামসাগারাম মাঝি: সম্মুখ সমরে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা

সাগারাম মাঝি: সম্মুখ সমরে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা

মাহমুদ মীর

মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন সাগারাম মাঝি। দেশমাতৃকার এই লড়াকু সৈনিক তবুও প্রাপ্য সম্মান পাননি। সময়ের ব্যবধানে তিনি হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির আড়ালে।

“সমতলের আদিবাসীদের মহান জননেতা” সাগারাম মাঝি। বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম আদিবাসী নেতা যিনি পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। ছিলেন জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ সহচর। মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে রেখেছিলেন সাহসী ভূমিকা। কিন্তু তবু প্রাপ্য সম্মান পাননি দেশমাতৃকার এই লড়াকু সৈনিক। সময়ের ব্যবধানে সাগারাম মাঝি হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে।

ইন্টারনেট বা বই-পুস্তক ঘেঁটে সাগারাম মাঝি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বেশ কয়েকজন আদিবাসী নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগারাম মাঝি স্বাধীনতার আগে এবং পরে উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতিতে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পাশাপাশি সার্বজনীন শিক্ষার বিস্তারে তার প্রচেষ্টা ছিল উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ জাতীয় নেতার এ এইচ এম কামরুজ্জামানের অনুসারী ছিলেন সাগারাম মাঝি। তারই ফলশ্রুতিতে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর লেখা “আদিবাসী নাম-বিতর্ক” শীর্ষক প্রবন্ধে সাগারাম মাঝির অসামান্য অবদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রাজশাহীর সাঁওতাল আদিবাসীদের নেতা ছিলেন সাগারাম মাঝি। তিনি ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।

ওই প্রবন্ধে শিক্ষা বিস্তারে সাগারাম মাঝির স্বউদ্যোগী হয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলা ছাত্রবাসের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। ওই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, রাজশাহী শহরের সাগরপাড়ায় আদিবাসীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৯৫৪ সালে সাগারাম মাঝি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি আদিবাসী ছাত্রাবাস। দেশ স্বাধীন হলে তিনি ছাত্রাবাসটি দ্বিতল ভবন করেন এবং তার মৃত্যুর পর সেটার নামকরণ হয় “সাগারাম মাঝি আদিবাসী ছাত্রাবাস”।

১৯০১ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কেন্দুবুনা পাড়ায় জন্ম নেয়া সাগারাম মাঝি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং বলেন, নিজে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার সুযোগ না পেলেও অর্জিত বিদ্যার আলোটুকু তিনি ছড়িয়ে দিতে ব্রতী হয়েছিলেন সমাজের অনগ্রসর সাঁওতাল ও ওঁরাও জনগোষ্ঠীর মাঝে। তারুণ্যে তিনি নিজের গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের গ্রাম দেলশাদপুরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া মুক্তির পথ নেই।

তিনি বলেন, ১৯৪৭-৫০ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্রিটিশ সরকার ধরপাকড় শুরু হলে সাগরামও আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। এরপর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সীমিত হয়ে পড়ে তার কর্মকাণ্ড। তবে তিনি একেবারে থেমে যাননি। ১৯৭৬ সালে স্থানীয় সরকার কাঠামোর অধীনে স্থানীয় গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। ১৯৭৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

রাজশাহীর ৫ নং গোগ্রাম ইউপির সরকারি ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যানদের তালিকাতেও সাগারাম মাঝির নাম পাওয়া যায়।

সাগারাম মাঝি সম্পর্কে ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, “দেশে আদিবাসীদের যে সংখ্যা সেই অনুপাতে তারা মুক্তিযুদ্ধে অনেক বেশি হারে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। যদি বাঙালি জাতি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তিলাভ করে এটা তার মুক্তির পথকে নির্মাণ করবে। কাজেই তারা অংশগ্রহণ করেছে।”

মুক্তিযুদ্ধে সাগারাম মাঝির মতো সরাসরি অংশগ্রহণ করেও আদিবাসীদের অনেকেই এখনো পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ইতিহাসে নির্মোহভাবে উঠে আসেনি তাদের বীরত্বগাঁথা। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ কতজন আদিবাসী শহীদ হয়েছেন তার হিসাব পাওয়া যায়না কোথাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের দাবি, মুক্তিযুদ্ধে সাগারাম মাঝির অবদান স্মরণে অবিলম্বে প্রশাসনকে ভূমিকা নিতে হবে। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের ভূমিকাও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular