মাহমুদ মীর
রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর–
১. নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা,
২. প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা।
এছাড়া অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ভূমিকা ও সদাচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ এগিয়ে আসছে। জোরদার হচ্ছে প্রার্থীদের নির্বাচনী তৎপরতা। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার। এবারের নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে মাঠে নেমেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে প্রচার শুরুর প্রথম দিন থেকেই সারা দেশে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা আর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। অনুমতি ছাড়া মিছিল করা, পোস্টার-ব্যানার টানানো, নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচার, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষের কর্মীদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগ আসছে প্রায় প্রতিদিনই। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন একদিকে শোকজ নোটিশ, জরিমানা ও সতর্কবার্তা জারি করলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্ন তুলছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের এসব ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কয়েকটি দল। এ বিষয়ে ইসি সূত্র জানিয়েছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে ইসি। সব ধরনের অভিযোগই তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। তার পরও নির্বাচনি আচরণবিধি মানা দূরে থাক, নিজেদের দেওয়া অঙ্গীকারই রক্ষা করছেন না অনেক প্রার্থী। আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রায় সব দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। এসব ঠেকাতে এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে ভোটের মাঠ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা নির্বাচন বিশ্লেষকদের।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকেই বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। ঢাকা-১৫ আসনে প্রতীক বরাদ্দ শেষে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন অভিযোগ করেন, জামায়াত আচরণবিধি লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এবং নারী কর্মীদের দিয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে। তার দাবি, এসব ঘটনায় বিএনপির কর্মীদের মারধরও করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো বিএনপির বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ ও হামলার অভিযোগ তুলেছে। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, তাদের নারী কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপির কর্মীরা তাদের ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে এবং সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। বিদ্যুতের তারে পোস্টার ঝোলানোসহ বিএনপির কর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
গতকাল রবিবার ইসিতে গিয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, বরিশাল, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের নেতা-কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। এ বিষয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা দৃশ্যত নিষ্ক্রিয় ও হতাশাজনক। এ ছাড়া তাদের প্রার্থীদের ওপর হামলার পরও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের ঘাটতি রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত শতাধিক প্রার্থীকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে শোকজ ও জরিমানা করা হয়েছে। এসব প্রার্থী বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির। এ ছাড়া কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় শোকজ ও জরিমানা করা হয়েছে। কয়েকটি জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শোকজের পর প্রার্থীদের সতর্ক করেই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
ভোটের মাঠে আচরণবিধি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বল ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। এবি পার্টিসহ একাধিক দল বলছে, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় থানায় জিডি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে প্রশাসন যদি দৃঢ় না হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।’ তার মতে, আচরণবিধি কার্যকরে ইসি যদি দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত আইনি লাগাম টানতে না পারে, তাহলে ভোটের মাঠ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
ভোটের মাঠে আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। তিনি জানান, সংবিধান ও প্রযোজ্য নির্বাচনি আইন অনুযায়ী কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে অভিযোগ যাচাই করছে। তিনি আরও জানান, কমিশনের হাতে কারণ দর্শানোর নোটিশ, জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিলের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কমিশন জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল থাকবে।
ইসি সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। অভিযোগের সংখ্যা বাড়লে শোকজের বাইরে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ জনকে শোকজ করা হয়েছে। নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বিএনপির ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১৮, এনসিপির ৪, ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুজন, গণ অধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির একজন করে আছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন পাঁচজন। এসব নোটিশের মধ্যে ৪৪টির শুনানি বা নিষ্পত্তি হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতে প্রার্থী ও সমর্থকদের জরিমানা করার খবর পাওয়া গেছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে এখন পর্যন্ত মাদারীপুরে তিনটি ঘটনায় তিন প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গোলাম মসীহকে ১০ হাজার টাকা, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগে সানোয়ার হোসেন নামের একজন জামায়াত কর্মীকে ১ হাজার টাকা জরিমানা, লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শিহাব আহমেদকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য ২০ হাজার টাকা জরিমানা, ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের এক কর্মীকে ২ হাজার টাকা এবং ফেনীর তিনটি আসনে ১২ প্রার্থী ও তাঁদের নেতাদের ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।




