অর্থনীতি ডেস্ক: “ক্যাশলেস লেনদেনে বাংলা কিউআরের প্রচলন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিউআর পেমেন্ট প্রচলিত অন্যান্য সব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা হতে সহজলভ্য ও নিরাপদ। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের মতো দেশগুলোতে কিউআর পেমেন্ট বেশ জনপ্রিয়।”
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের আগেই নগদ চালু করেছে বাংলা কিউআর। এর কারণে নগদ অ্যাপ থেকে পেমেন্ট অনেক বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও নগদ-এর প্রশাসক মো. মোতাছিম বিল্লাহ।
মোতাছিম বিল্লাহ জানান, বাংলা কিউআর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত কিউআর কোড-ভিত্তিক একটি ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা।
সব ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বাংলা কিউআর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কিউআর কোড দিতে বাধ্য, ফলে এক প্রতিষ্ঠানের বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপির অ্যাপ থেকে পেমেন্ট করা যাবে।
বাংলা কিউআর
বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে গ্রাহকের বাড়তি কোনো খরচ নেই। অর্থাৎ গ্রাহক ১০০ টাকার পণ্য বা সেবা ক্রয় করে ১০০ টাকাই পেমেন্ট করবেন, বাড়তি কোনো ফি বা চার্জ দিতে হবে না।
নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে এগোতে বাংলা কিউআর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে দেশের মার্চেন্ট পেমেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে বড় শপিংমল থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র দোকান বা ফুটপাতের ব্যবসায়ী—সবাই একটি অভিন্ন কিউআর কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারছেন।
ক্যাশলেস যাত্রায় বাংলা কিউআর যুগান্তকারী পদক্ষেপ
বাংলা কিউআর হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের জাতীয় ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা। এর প্রধান সুবিধা হলো, একজন ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন ব্যাংক বা এমএফএসের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড রাখতে হয় না। একটি বাংলা কিউআর কোড থাকলেই অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতার গ্রাহকের কাছ থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট নেওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাতেও বাংলা কিউআরকে আন্তঃপরিচালনযোগ্য খুচরা পেমেন্টের জাতীয় মান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলা কিউআরে টাকা দেবেন কীভাবে ধরা যাক। আপনি একটি দোকান থেকে ৫০০ টাকার পণ্য কিনেছেন। দোকানে থাকা বাংলা কিউআর কোডটি মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংকিং অ্যাপের QR Scan অপশন দিয়ে স্ক্যান করতে হবে। এরপর স্ক্রিনে দোকানের নাম বা মার্চেন্টের তথ্য দেখে ৫০০ টাকা লিখে পেমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী PIN বা অন্য নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হবে। সফল লেনদেনের পর গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লেনদেনের তথ্য দেখতে পারবেন। অর্থাৎ নগদ টাকা বহন, ভাঙতি খোঁজা বা অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আরেকটি উদাহরণ হতে পারে ফুটপাতের একটি চায়ের দোকান। একজন ক্রেতার কাছে নগদ টাকা নেই, কিন্তু তার ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ রয়েছে। দোকানির বাংলা কিউআর স্ক্যান করে চায়ের বিল পরিশোধ করলেই লেনদেন শেষ। একইভাবে বড় সুপারশপেও পণ্য কেনার পর ক্যাশ কাউন্টারে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে বিল দেওয়া সম্ভব।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রচলিত কার্ড পেমেন্ট গ্রহণের মতো ব্যয়বহুল POS মেশিনের পরিবর্তে কম খরচের কিউআর স্টিকার দিয়েই ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা যায়।
এ ব্যবস্থায় লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হয়। ফলে ব্যবসায়ীর আর্থিক কার্যক্রমের একটি নথিভুক্ত ইতিহাস তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক সেবা ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ বহন ও ব্যবস্থাপনার ঝুঁকিও কমে।
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ৪২টি ব্যাংক, ৭টি এমএফএস এবং ৩টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বাংলা কিউআর সুবিধা দিচ্ছিল। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন ইউনিট’ করেছে।
১ জুলাই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরুর পরও ব্যবহার বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ও ১ জুলাই—এই দুই দিনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ৭৭ হাজার ১৬৫টি লেনদেনে ২২ কোটি ২ লাখ টাকা পরিশোধ হয়েছে।
ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ
বাংলা কিউআরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়াতে চাইছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছে।-
বাংলা কিউআর শুধু অর্থ পরিশোধের একটি প্রযুক্তি নয়; এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ গ্রাহক, সবাইকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ। এর ব্যবহার যত বাড়বে, ততই নগদনির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ, দ্রুত ও স্বচ্ছ ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।




