হিলাল ফয়েজী
গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’— যার অর্থ জাতি বা উপজাতি। ল্যাটিন শব্দ ‘সাইড ‘যার অর্থ হত্যা। এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে জেনোসাইড। ১৯৪৪ সালে পোল্যান্ডের আইনজীবী রাফায়েল ল্যামকিন সর্বপ্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। জেনোসাইড বিষয়টি হত্যাকান্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এটি এমন একটি অপরাধ যেখানে কোন জাতি, গোষ্ঠী, বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস বা মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়।
১৯৭১ সাল জুড়ে বাংলাদেশ প্রান্তরে শত শত জেনোসাইড সংগঠিত ভাবে সংঘটিত হয়েছে। ‘ত্রিশ লক্ষ নাকি তিন লক্ষ’— এমন অমানবিক হীন বিতর্ক তুলে দেয় একাত্তরকে মহিমাচ্যূত করতে কোন কোন হীনচক্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃতদের পরিসংখ্যান ঠিক ঠিক মতো হয়েছে কী? সম্ভব নয়। আনুমানিক হিসাবেই মানবজাতি চলে। কিন্তু বাংলাদেশ অঞ্চলে একাত্তরে সংঘঠিত অসংখ্য জেনোসাইড নিয়ে তর্ক তোলার অবকাশ নেই। সে জেনোসাইডের জন্য অপরাধীদের বিচার চান নাকি তাদের চুম্বন করবেন সেটা ভিন্ন কথা।
আজ ২০ মে। ৫৫ বছর আগে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে যে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল সেটি যে মানবইতিহাসে জানামতো স্বল্পতম সময়ের বৃহত্তম জেনোসাইড তা পৃথিবী ঠিকমতো জানে না। জাতিসংঘের অসাড় কর্ণ। কিন্তু আমরা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ- অনুকূল ক’জনই বা জানি। এই না জানাটিও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জাতিগত অজ্ঞতার দুঃখজনক পরিচয়। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে ১৯৭১ সনে যে বিশাল জেনোসাইড-গণহত্যালীলা সংঘটিত হয়েছে, তা স্বীকৃতি পায়নিআজো।এ জন্য আমরা হা হুতাশে কাল কাটাবো না। আমাদের কাজ চলছে, চলবে। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও একাত্তরের জেনোসাইড-এর স্বীকৃতি আদায়ের দৃঢ়পণ প্রচেষ্টা চলবেই। অপরাধীদের বিচার হতেই হবে।
১৯৪৭ সনে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের তরবারিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম ভাগে মোট পাঁচটি বড় জাতিসত্তা বিরাজমান ছিল। পূর্ব ভাগে বাঙালি। পশ্চিম ভাগে পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধী এবং বেলুচী। পাকিস্তানের শাসনভার কার্যতঃ পাঞ্জাবি সেনা, আমলা ও বিত্তবানদের হাতে ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম ভাগের মধ্যে যে আঞ্চলিক বৈষম্য ছিল তা অবর্ণনীয়। একালের বৈষম্যবিরোধী তরুণেরা তা অবহিত নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে আঞ্চলিক বৈষম্যবিরোধী এমন গণবিদ্রোহী সংগ্রাম গাথা কোথাও রচিত হয়নি। ১৯৫২ তে আমরা বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সফল হয়েছি। ১৯৭১ সনে ভূমির অধিকার অর্জন করেছি। নদীমাতৃক বাংলাদেশ রক্তমাতৃক বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল ১৯৭১ সনে।
ভদ্রা তেমনই একটি নদী। চুকনগর বাজারের পাশ দিয়ে সমুদ্রপানে চলে যাওয়া সেই নদীকে মানবেতিহাসের স্বল্পতম সময়ে সংঘটিত বৃহত্তম জেনোসাইডের রক্তপ্লাবনে প্রবাহিত করে দিয়েছিল পাকিস্তানের দখলদার নৃশংস সেনাদল। চুকনগর জেনোসাইড বস্তুতঃ ছিল একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকায় শুরু হওয়া জেনোসাইড ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এবং ‘অপারেশন বিগবার্ড’ এরই প্রলম্বিত অংশ। সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের আমলা-সামন্তগোষ্ঠী ও সেনানেতৃত্ব এই গণরায়কে না মেনে রক্তে ডুবিয়েছিল ২৫ মার্চ, ৭১-এ। সে রাতে ‘বিগ বার্ড’ বঙ্গবন্ধুকে ওরা গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেল। গ্রেপ্তার হবার পূর্বেই কৌশলে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গেলেন গণরায়ে বিজয়ী নেতা। সেই থেকে পৃথিবী পেলো এক নব মানচিত্র। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।
অপারেশন সার্চ লাইট এর অংশ হিসেবে নৃশংস অভিযান চললো দেশ জুড়ে ।বুলেট বেয়োনেট আগুন ধর্ষন।প্রান্তিক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাস বিশেষত দক্ষিণ বাংলার জনপদ জুড়েই ।বৃহত্তর বরিশাল-খুলনা -যশোর- ফরিদপুর থেকে লক্ষ লক্ষ বিপন্ন জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে দেশান্তরের মরিয়া সিদ্ধান্ত নিল।সঙ্গে নিল যার যার শেষ সম্বল ।হাজার হাজার নৌকা নিয়ে লাখ মানুষ উপনীত হলো ভদ্রা নদী তীরের চুকনগর বাজার প্রান্তরে । সুবিধামতো প্রতি সন্ধ্যায় সীমান্ত পাড়ি দিতে তারা চুকনগরে অপেক্ষমান থাকছিলো । পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অনুচরেরা শরণার্থীদের খবর পৌঁছে দিলে যশোর সেনানিবাসে। সাতক্ষীরা ক্যাম্প থেকে ১৯৭১ এর ২০মে বিষুধবার সকালে ঘাতক পাকি সেনারা বিপুল অস্ত্র ও বুলেট নিয়ে হাজির হলো চুকনগর বাজারে । ওরা কেউ রান্না করছিলো । মালপত্র গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলো ।মাতৃদুগ্ধ পান করছিল শিশু। হঠাৎ নেমে এলো পার্থিব নরক। পাকি হিংস্র সেনারা শুরু করলো বেপরোয়া বুলেট বর্ষণ । অবিরাম তা চললো চার পাঁচ ঘন্টা । রক্তরন্যা। চিৎকার । আর্তনাদ । হাজার হাজার শবদেহ । সৎকার অসম্ভব । স্থানীয় উদ্যোগে ভদ্রা নদীতে সব লাশ ভাসিয়ে দেবার ব্যবস্থা হলো।
সেদিন কতোজন মারা গিয়েছিলো? সে সাক্ষ্য দিতে অপারগ ভদ্রা নদী। কেউ বলে বিশ, কেউ বলে ত্রিশ হাজার। গবেষকরা বলেন, কমপক্ষে দশ হাজার। এবার মানবইতিহাসে খোঁজ করে দেখুন। চুকনগরের এই জেনোসাইড ঘটনাটি স্বল্পতম সময়ে বৃহত্তম গণহত্যালীলা কিনা। জেনোসাইডের সংজ্ঞা বিচারে এমন নৃশংস-বিশাল হত্যাকাণ্ড আর কোথাও হয়েছিল কিনা।
নিহতের শবদেহ সৎকারের উপায় ছিলো না। ভদ্রা নদীতে সেই লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। জোয়ার ভাটায় সে লাশ মাসখানেক ধরে এদিক ওদিক ভাসছিলো। সে লাশ বঙ্গোপসাগরেও পৌঁছেছিলো।
১৯৭১ বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিচার এখনও মেলেনি। স্বল্পতম সময়ে মানবেতিহাসের বৃহত্তম চুকনগর জেনোসাইডের ক্ষেত্রেও একই। জাতিসংঘের অসাড় কর্ণে সাড়া জাগাতে প্রচেষ্টা হয়েছে। জেনোসাইড বাংলাদেশ, জেনোসাইড চুকনগর, সবকিছুর স্বীকৃতি আদায় ও বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ-বিবেক জেগে ওঠো, দাঁড়াও এবং এগিয়ে চলো প্রতিদিন।
চুকনগরসহ একাত্তরের সকল শহীদএবং জনযোদ্ধাদের অভিবাদন।




